ইনসোমনিয়া (Insomnia) সমস্যা! কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে জানুন

রাতে ঘুমাতে গেলে যে কারণে ঘুমাতে পারেন না সেটাই হলো ইনসোমনিয়া। কিছু কিছু মানুষ আছেন যাদের রাতেরবেলা একেবারেই ঘুমুতে পারেন না। এতে করে খুব স্বাভাবিক তিনি দিনেরবেলা ঢুলুঢুলু থাকেন, শিক্ষাজীবন হোক বা কর্মজীবন হোক এর রয়েছে মারাত্মক ক্ষতিকর দিক।

ইনসোমনিয়া (Insomnia) সমস্যা! কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে জানুন
ইনসোমনিয়া (Insomnia) সমস্যা! কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে জানুন

ইনসোমনিয়া (অনিদ্রা) সম্পর্কে আমরা কম বেশি সবাই ওয়াকিবহাল। কিন্তু এটি যে একটি গুরুতর মানসিক সমস্যা সে ব্যাপারে আমাদের ধ্যান কম। অনেকক্ষেত্রে নেই বললেই চলে। প্রসঙ্গত, এর আগেও কিছু মানসিক সমস্যা সম্পর্কে আমি লিখেছি। চেষ্টা করেছি লেখাগুলোকে তথ্যবহুল রাখার। কোন কোন ক্ষেত্রে হিতে বিপরীত হয়েছে, মানে আমাদের অল্প-স্বল্প কোন সমস্যা থাকলেও সে বিষয়ে নিজেরা ভূগছি বলে দাবী করার প্রবণতা লক্ষ্য করেছি।


এর খারাপ দিক কি? এর খারাপ দিক হলো, সমস্যাটি যেহেতু মানসিক আর আপনি মনে মনে গেঁথেও নিচ্ছেন আপনি উক্ত রোগে আক্রান্ত তবে হতে পারে একদিন সত্যি সত্যিই সেই রোগটি আপনার মনে বাস বানায় এই সম্ভাবনা।


ইনসোমনিয়া (Insomnia) মূলত কী?

রাতে ঘুমাতে গেলে যে কারণে ঘুমাতে পারেন না সেটাই হলো ইনসোমনিয়া। কিছু কিছু মানুষ আছেন যাদের রাতেরবেলা একেবারেই ঘুমুতে পারেন না। এতে করে খুব স্বাভাবিক তিনি দিনেরবেলা ঢুলুঢুলু থাকেন, শিক্ষাজীবন হোক বা কর্মজীবন হোক এর রয়েছে মারাত্মক ক্ষতিকর দিক।


যদিও ইনসোমনিয়াকে সাধারণ শব্দে বলা হয়- যখন ঘুম ঠিক মত হয় না বা ঘুম আসে না। কিন্তু যদি গভীরভাবে এটাকে পর্যবেক্ষণ করা যায় তাহলে বিভিন্ন ভাগে এটাকে বিভক্ত করা যায়। তো আজকের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, “ইনসোমনিয়া (Insomnia)” ।


ইনসোমনিয়া (Insomnia) এর উপসর্গ সমূহ

বিশেষ বিশেষ কয়েকটি উপসর্গ আমি এখানে উল্লেখ করছি,

১. ঘুম না আসা

২. মাথাব্যাথা করা

৩. কাজে মনোনিবেশ করতে না পারা

৪. সারাদিন ক্লান্তিতে কাটা

৫. মুড সুয়িং ইত্যাদি।


এছাড়া রাতের ঘুমের ক্ষেত্রে আমরা তিন সেকশনে আমাদের ঘুম কে বিভক্ত করতে পারি,

১. ঘুম ঠিক মত না আসা। এক্ষেত্রে ঘুমানোর পর দুই বা তিনঘন্টা চলে যাচ্ছে কিন্তু ঘুমের কোন খবর নেই। এপাশ থেকে ওপাশ হচ্ছেন কিন্তু ঘন্টাও ফারাক পড়ছে না।

২. ঘুম তো আসে কিন্তু খুব সহজেই ভেঙ্গে যায়। এই ধরণের মানুষ যারা আছেন তাদের রাতে কয়েক দফা ঘুম ভেঙ্গে যায় যার ফলে নতুন করে ঘুম আসে না।

৩. ঘুমও আসে, ঘুম ভাঙ্গেও না। কিন্তু খুব সকাল সকাল ঘুম ভেঙ্গে যায়।


এসব হলো রাতের সমস্যা। কিন্তু দিনেও যদি ঘুম আসা বন্ধ হতে শুরু করে বা এই ধরণের সমস্যা দেখা দেয় তবেই সেটাকে ইনসোমনিয়া বলা হয়ে থাকে। দিনে বহু রকমের সমস্যা হতে পারে। যেমন ধরুন, ক্লান্তি আসা, মাথাব্যাথা করা, মুড সুয়িং, মনোযোগে সমস্যা ইত্যাদি।


ইনসোমনিয়া (Insomnia) এর প্রকারভেদ

বেশ কয়েক ধরণের ইনসোমনিয়া আছে। সেসবের মধ্যে প্রধান দুটি হচ্ছে,

১. Acute Insomnia

ও ২. Chronic Insomnia


Acute Insomnia – এর ক্ষেত্রে কী ঘটে?

Acute Insomnia – হচ্ছে “শর্ট টার্ম ইনসোমনিয়া”। এই ইনসোমনিয়া কয়েকটা দিন বা কয়েক সপ্তাহ জুড়ে ঘটতে পারে। এই ধরণের ইনসোমনিয়া কারো মধ্যে প্রবেশ করার বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে। যেমন ধরুন, কারো মাঝে অনেক বেশি বাজে অভিজ্ঞতা আছে, অথবা স্ট্রেস আসার জন্যও হয়ে থাকে। হতে পারে সেটা কাজের চাপের জন্য স্ট্রেস আসছে বা অনেক চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে কিন্তু সমাধান মিলছে না।


তবে বেশ দ্রুত এই ধরণের ইনসোমনিয়া থেকে উদ্ধার পাওয়া যায়। কারণ এটা শর্ট টার্ম বা সাময়িক ইনসোমনিয়া। তাই এই ধরণের ক্ষেত্রে কোন ধরণের মেডিসিন বা থেরাপি নেবার প্রয়োজন পড়ে না।


Chronic insomnia – এর ক্ষেত্রে কী ঘটে?

Chronic insomnia – এর ক্ষেত্রে অনেক কারণ দেখা দিতে পারে। কোন শারীরিক সমস্যা যা দীর্ঘ সময় ধরে চলছে যেমন, জয়েন্ট প্রব্লেম, ব্যাক-এজ বা হার্টের সমস্যা। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, আমরা ঘুমানোর জন্য কিছু ট্যাবলেট নিয়ে থাকি। এসবের সাইড-ইফেক্ট মারাত্মক। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর ঘুমের ট্যাবলেট নিলে এই ধরণের সমস্যা আরো বাড়তে পারে।


তৃতীয় ধাপে যে বিষয়টি রাখছি সেটা হলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের রুটিন। অনেকের আমার মত রাত জাগার অভ্যেস থাকতে পারে। এতে সমস্যা কি? এতে সমস্যা হচ্ছে, যখন আপনি খুব দ্রুত ঘুমাতে যাবেন তখন কিন্তু দ্রুত ঘুমাতে পারবেন না।


আপনার যে রুটিন আছে বা যে অভ্যেস আছে ঠিক সেই সময় ছাড়া ঘুমানো মুশকিল হতে পারে। এছাড়াও আমরা যারা ল্যাপটপে, ডেস্কটপে কাজ করি বা যে কোন অনলাইন গ্যাজেটে কাজ করছি এসবও আমাদের অনিদ্রার কারণ হতে পারে।


আরো বিভিন্নভাবে ইনসোমনিয়াকে ব্যাখ্যা করা যায়। শরীর যখন ক্লান্ত-ই না হয় বা কোন চিন্তা থেকে মুক্তি-ই না পায় তবে চোখে ঘুম আসবে কি করে? আমাদের শরীর ক্লান্ত হওয়াও তো জরুরী আর পাশাপাশি শান্ত একটি মস্তিষ্ক দরকার।


যে ব্যক্তি কোন বিষয়ে গভীর চিন্তায় সারাক্ষণ মগ্ন থাকেন বা দুঃশ্চিন্তায় থাকেন তারপক্ষে ঘুম না আসা খুব স্বাভাবিক।


ইনসোমনিয়া (Insomnia) নিয়ে কথা বলা জরুরী কেন?

বর্তমানে টিনেজারদের মধ্যেও ইনসোমনিয়া হয়ে উঠেছে একটি প্রাসঙ্গিক বিষয় এবং ভয়ংকর একটি সমস্যা। এছাড়াও বিভিন্ন বয়সী মানুষদের মধ্যে ইনসোমনিয়া লক্ষ্য করা যায়। এটা এক ধরণের সাইকোলজিক্যাল সমস্যা। কিন্তু এই সাইকোলজিক্যাল সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে উক্ত ব্যক্তির মধ্যে নানাবিধ শারীরিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে।


ইনসোমনিয়া (Insomnia) কেন হয়?

প্রধান তিনটি মানসিক সমস্যার কারণে এই রোগ আমাদের ধরতে পারে,

১. Stress

২. Anxiety

৩. Depression


যখন আমরা এমন কিছু বিষয়ে চিন্তা করি যার কারণে আমাদের মন অধিক সক্রিয় হয়ে পড়ে যেমন, অফিস ওয়ার্ক, স্টুডেন্টদের জন্য পরিক্ষার প্রেসার, এক বিজনেসম্যানের জন্য শেয়ার মার্কেটের উপরে ওঠা বা নীচে নামা, অথবা ফাইনান্সিয়াল কন্ডিশন খারাপ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। এসবের জন্য আমাদের মন অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে পড়ে এবং ঘুম আসা কঠিন হয়ে যায়।


এছাড়া আপনাকে জুড়ে অতীতের কোন খারাপ অভিজ্ঞতা যদি থেকে থাকে এবং তার বাজে প্রতিক্রিয়া আপনার উপর এসে পড়ে তাহলেও এই সমস্যা হতে পারে। যেমন, পরিক্ষায় ব্যর্থ হওয়া, জব চলে যাওয়া, ব্রেকাপ/ডিভোর্স হয়ে যাওয়া, কোন সিরিয়াস রোগ বা কাছের কারো মৃত্যু ঘটা। এসব ক্ষেত্রেও ইনসোমনিয়া ডেভেলপ হবার সম্ভাবনা থাকে।


তাছাড়াও আমাদের বদ অভ্যাস যেসব থাকে যেমন বেশি বেশি টেলিভিশন দেখা, স্মার্টফোন ব্যবহার করা, ঘুম থেকে উঠার কোন রুটিন নেই এসবও ইনসোমনিয়াকে পয়দা করতে পারে।


ইনসোমনিয়া (Insomnia) এর ট্রিটমেন্ট কি?

সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্টের আগে এমন কিছু বিষয়ে কথা বলা যাক যা আমরা নিজেরাই করতে পারি।

১. প্রথমে আমাদের ঘুমানোর এবং ঘুম থেকে উঠবার সঠিক সময় নির্ধারণ করা উচিত।

২. যদি অনেক বেশি ক্লান্ত লাগে এবং প্রচন্ড ঘুম পায় তবে একটা কুইক ন্যাপ নেওয়া ভালো।

৩. কোন কাজ আটকে আছে বা আরো বেশি পড়বার প্রয়োজন আছে এতে করে যদি নিজেকে জোর করে আমরা জাগিয়ে রাখি এতেও এই সমস্যা হতে পারে।

৪. সন্ধ্যাবেলায় একটু অনুশীলন বা হাঁটাহাঁটিও অনেক কাজের।

৫. এছাড়া যে রুমে থাকেন সেই রুম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করুন। পাশাপাশি সেই রুমে অনেক জিনিসপত্র না রাখাই ভালো।

৬. খাবার খেয়েই ঘুমাতে যাওয়া ঠিক হবে না। আপনি খাবার শেষে নিজেকে একটু সময় দিন, একটু ঘুরে আসুন তারপর ঘুমান।

৭. ঘুমানোর পূর্বে ফোন ও ইন্টারনেটের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।


এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো আপনাকে ইনসোমনিয়া থেকে দূরে রাখবে। আর যদি আপনি খুব খারাপ মানসিক স্টেজে থাকেন সেক্ষেত্রে আপনি সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে পারেন।


আজ এই পর্যন্তই। অন্য কোন একদিন কোন বিষয়ে কথা। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।


আরও পড়ুনঃ ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা এড়িয়ে যাবার মতন সমস্যা নয়