এক বই পাগলের নিউইয়র্ক দর্শণ - ছোটগল্প

নিউইয়র্ক শহরের ম্যানহাটানে ঠিকানা খোঁজা ভীষণ সরল। গোটা শহরে লম্বা লম্বা এগারোটা এভিনিউ- এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, করে। আর আড়াআড়ি পর পর অনেক গুলো স্ট্রীট। ঊনষাট অবধি সোজা, তারপর একটু জটিল। এক স্ট্রীট থেকে আর এক স্ট্রীট পৌঁছতে খুব জোর তিন মিনিট আর এক এভেন্যু থেকো আর এক এভিন্যু পৌঁছতে বড় জোর পনেরো মিনিট।

এক বই পাগলের নিউইয়র্ক দর্শণ - ছোটগল্প
এক বই পাগলের নিউইয়র্ক দর্শন - ছোটগল্প

বই পাগল লিখছে- প্যারিসে আইফেল টাওয়ার কে দেখে? ঐ নাটবল্টুর অতিকায় আকাশ ছোঁয়া স্থাপত্য! ওটার কি আকর্ষণ! তার চেয়ে চল শ্যেন নদীর তীরে সেই ঐতিহ্যময় শেক্সপিয়র এন্ড কোঃ তে বই ঘাঁটতে!


কী অসাধারণ বল! এই দোকান সেই দোকান যেখানে আড্ডায় বসতেন জয়েস, এজরা পাউন্ড, হেমিংওয়ে! নেশা, নেশা নেশা কি খারাপ সব সময়? বই কেনার নেশারুদের কথা জানোনা?


সেই বই নেশারুরা আসতেন এই প্যারিসের দোকানে। কে না চাইবে আইফেল টাওয়ার না দেখে সার্ত্রের স্বাক্ষরিত বই নিজের সংগ্রহে রাখতে! নিউইয়র্কে আমি স্ট্যাচু অব লিবার্টি ও ফ্রিডম টাওয়ারও দেখিনি- তা নিয়ে তো লক্ষ লক্ষ ভ্রমণ কাহিনী লেখা হয়েছে। ট্যুরিস্টরা যা দেখে না, তা আমি দেখেছি। আরে, আমি যে এক বই পাগল! নিউইয়র্কে দারুণ দারুণ বইয়ের দোকান।


নিউইয়র্ক শহরের ম্য্যানহাটানে ঠিকানা খোঁজা ভীষণ সরল। গোটা শহরে লম্বা লম্বা এগারোটা এভিনিউ- এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয়, করে। আর আড়াআড়ি পর পর অনেক গুলো স্ট্রীট। ঊনষাট অবধি সোজা, তারপর একটু জটিল। এক স্ট্রীট থেকে আর এক স্ট্রীট পৌঁছতে খুব জোর তিন মিনিট আর এক এভেন্যু থেকো আর এক এভিন্যু পৌঁছতে বড় জোর পনেরো মিনিট।


তাই তো সিক্সথ এভিন্যু আর সাতান্ন নঃ স্ট্রীট এর ক্রসিং এর বাউম্য্যানস রেয়ার বুকস খুঁজে পাওয়া খুব সোজা। খুব যে বিশাল তা নয়, বাইরে সুদৃশ্য শোকেসে রাখা কয়েকটি পুরণো বই, সুন্দর বাঁধাই। ফকনারের প্রায় নতুন “এজ আই লে ডাইং” । আমি তো বই পাগলা মনে আছে আপনার?


দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলাম। চমৎকার হালকা এ সি। গরম ও সরাসরি সুর্যালোকে ও আর্দতায় বই খারাপ হয়ে যায় ঢুকতেই সুন্দরী, সুবেশা তরুণী এগিয়ে এলেন- দোকান তখন খালি, একটিও ক্রেতা নেই।


“মে আই হেল্প ইউ স্যর?” মনে প্রচুর আত্মবিশ্বাস, পকেটে পাঁচশো ডলার। বললাম- না, এই একটু ঘুরে দেখছি। সুন্দরীটি একটুও দমলেন না। পরের প্রশ্ন-কোনও বিশেষ সংগ্রহ চাই কি স্যর?


খেয়েছে রে এ যে আরও বিপদ! কাষ্ঠ হাসি হেসে বললাম- এই মডার্ন আর্ট মডার্ন আর্ট মানে ১৯৫০- ১৯৫৫ এর পর যে সব বই, তার প্রথম সংস্করণ। ততক্ষণে এই আমি বই পাগলার ধারণা হয়েই গেছে এদের এতো ভাল পুরণো স্টকস- নামই বাউম্যানস রেয়ার বুকস, এদের কাছে নতুন বই কি ভাবে থাকবে!


তরুণী নাছোড়বান্দা- “এনি পার্টিকুলার রাইটার?” এ কি জ্বালা! ঈশ্বরে বিশ্বাস আছে, জানি রণে, বনে, জলে জঙ্গলে আর সাহিত্য আডডায় এবং বইয়ের দোকানে বিপদে পড়িলে গ্যাব্রিুএল গারসিয়া মার্কেসের নাম স্মরণ করতে হবে। আমিও করলাম। সুন্দরী ফুরুৎ করে ভিতরে গেলেন উচ্চারণ করে- এক্সেলেন্ট।


বাঁচা গেল। আমি নিশ্চিন্ত মনে বই দেখায় মনোনিবেশ করলাম। আবার তাঁর আবির্ভাব- এবারে হাতে সাদা গ্লাভস পরা, একটা চাবি সমেত। শো কেস খুলে বার করলেন- ১৯৭০ সালে প্রকাশিত “ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিচ্যুড” - প্রথম সংস্করণ।


কি ঝকঝকে চেহারা, এতো নতুন অবস্থায়! মলাটে রয়েছে গাই ফ্লেমিং এর সুবিখ্যাত প্রচ্ছদ ‘ড্রিমারস রাইজ’। এরপরে দেখালেন, অতি সন্তর্পনে খুললেন ব্লার্কের বিখ্যাত ভুল দেখানো বই। গছাবেই গছাবে। বাপ রে বাপ। দাম কত? মাত্র পাঁচ হাজার ডলার। বই পাগলার আত্মবিশ্বাস চুপসে আমশি।


আমার মুখের অবস্থা দেখে তরুণী ডেনিস লিলির মতো দ্বিতীয় বাউন্সার ছাড়লেন- “লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা” -ও আছে। দেখুন দেখলাম সেই বিরল সংস্করণ মাত্র তিনশো কপি ছাপা হয়েছিল- অটোগ্রাফ করা লিমিটেড এডিশন। হলু আর সবুজে সাজানো তার দাম মাত্র ছ’হাজার ডলার! নাঃ! পাঁচশো ডলারের কোন বই নেই।


যুদ্ধে হেরে যাওয়ার মতো অবস্থায় দোকানের বাইরে বেরিয়ে আসার আগে সুন্দরী একটি ক্যাটালগ ধরিয়ে দিলেন। গেলাম বইয়ের দোকান আরগোসি। ঊনষাট তম স্ট্রীটে। এখানে একটু কম দামী বই আছে। দু, তিন ডলারে পেপারব্যাক। অথচ ফকনার এর প্রথম সংস্করণ সাড়ে সাতশো ডলার।


আমি বই পাগল এবার গেলাম শহরের অন্য প্রান্তে - এলাবাস্টার বুকস- বারো নং স্ট্রীট। ছোট্ট দোকান, সব সাধারণ বই, পেপার ব্যাক। দুটো আলমারীতে রয়েছে হীরে, জহরত!


আলব্যের কামুর বিখ্যাত প্রবন্ধের বই “মিথ অব সিসিফাস” - দুশো ডলার। কিন্ত রেখে দিলাম। দেখি আর কি আছে। সামনেই রয়েছে সেরা দোকান-স্ট্যান্ড বুক স্টোর্স। বিশাল পাঁচ তলা।


আর বাইরে সারি সারি বইয়ের দোকান, কলেজ স্ট্রীটের মতো- সব সেকেন্ড হ্যানড। আর্ট, আর্টিটেকচার, রান্না বিউটি সব বই। আর ভিতরে! বই আর বই। বই পাগলা আমি পাগল হয়ে গেলাম। সরু গলির মতো বইয়ের র‍্যাক অক্ষর অনুযায়ী সাজানো।


ছিয়াশী বছর বয়সী এই দোকান নিউ ইয়র্কের সাংস্কৃতিক পাড়া গ্রিনিচ ভিলেজে ৪র্থ এভিন্যুতে স্থাপিত হয়েছিল। মাত্র ২৫ বছর বয়সী বেন বাস এটি বিশাল দোকানে পরিণত করেন ও পরবর্তী কালে তাঁর ছেলে ফ্রেড আরও বড়ো করে তোলেন।


কী নেই বা কে নেই দোকানে! পাশাপাশি বুক সেল্ফ তার দৈর্ঘ্য হবে তেইশ মাইল। দেকানে বই আছে ৩০ লক্ষ। আমি বই পাগল হলেও ‘হাঁ’ করে রইলাম। আর তিন মাইল হলে যে ম্য্যারাথন!


দোকানের কর্মচারীর সংখ্যা দু'শোর বেশী। গোটা আমেরিকায় এই দোকানের দুর্লভ বই বিখ্যাত। এতো বড়ো দোকানে ঘুরবো কি ভাবে! কি ছেড়ে কি দেখবো! কি ছেড়ে কি কিনবো।


নাঃ! বেরোই এখান থেকে। চলো যাই অন্য কোনো খানে! গেলাম অন্য দোকানে। সেখানে এতো বইয়ের মাঝে বই পাগল হার্টফেইল না করে! তো হলো সে ব্যবস্থা। পুনরায় সুন্দরীর আবর্ভাব। জিজ্ঞাসা করলাম- আপনাদের রেয়ার বুকস এর স্টক্স কোন জায়গায়?


“এলিভেটারে করে তিন তলায় উঠে যান।” আমাদের লিফট তথা আমেরিকার এলিভেটরে তিন তলায় থতমত খেয়ে গেলাম। এতো বিশাল! হলঘর, তাতে কাচের আলমারি জুড়ে বই। উঃ! এ কি অসামান্য সংগ্রহ!


কামু, মার্কেস, সারামাগো, পামুক- প্রথম সংস্করণ- স্বাক্ষরিত বইয়ের ছড়াছড়ি। হেমিংওয়ের সঙ্গে সহবস্থান ফকনার এর- প্রায় নতুন। সাধারণত যাদের দেখা পাওয়া দুষ্কবর সেই গিনসবার্গ বা পিনচন এর সই করা বই রয়েছে। বই পাগল তাকায় যে দিকে, সে দিকে সোনার খনি- সোনার দামে। প্রতিটি বইয়ে এমবস করা স্টিকার “স্ট্যানড রেয়ার বুকস'”


এই রেয়ার সেকশনে গ্রাহক রা আরামে বই দেখার সুয়োগ পান। কোন সুন্দরী এসে বই বাছবার বা বই দেখাবার বা হেল্প করতে এগিয়ে আসেন না কথায় কথায়। ইচ্ছে হলে একটু জিরিয়ে নেওয়া যায়। সোফা সেট রাখা আছে।


মার্কেসের সই সহ যে দুষ্প্রাপ্য বই হাতে পেল বই পাগলা, সেটা আর জন আপডাইকের ‘টেররিস্ট’ কিনে ফতুর হয়ে গেল বই পাগলা। নিচে নেমে এলো সে। হাতে খান তিনেক বই হলুদ প্লাস্টিকের ব্যাগে আর মনে বিশ্বজয়ের আনন্দ।


[তথ্যসুত্র- শুভায়ু বন্দ্যোপাধ্যায়]


আরও পড়ুনঃ স্টার্ট-আপ: আমার বন্ধু আবরার