এত আত্মহত্যা কেন হচ্ছে! আমাদের করণীয় কী!

আপনি হয়তো কোনভাবেই জানবেন না যে, একজন মানুষ কেন আত্মহত্যা করে থাকেন? বা কেন এই ধরণের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন! এমন মনে হতে পারে, উক্ত ব্যক্তির কাছে তো সব ছিলো তবুও কেন আত্মহত্যা করলেন? এর কারণ হলো, জীবনটাকে যেভাবে আপনি দেখছেন উক্ত ব্যক্তি সেভাবে জীবনকে দ্যাখেন নাই।

এত আত্মহত্যা কেন হচ্ছে! আমাদের করণীয় কী!
এত আত্মহত্যা কেন হচ্ছে! আমাদের করণীয় কী!

এটা কল্পনা করা মুশকিল যে, কেন একজন ব্যক্তি, পরিবারের কোন সদস্য অথবা সেলেব্রেটি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এ ব্যাপারে পরিষ্কার কোন বার্তা বা ধারণা নেই, এবং আপনি হয়তো ভেবে অবাক হবেন ঠিক কী কারণে আপনার কাছের মানুষটি আজ আর নেই! তবুও কিছু কিছু বিষয় মানুষকে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত করতে পারে।


১. মানসিক সমস্যা

অনেকক্ষেত্রে আবেগপ্রবণ হয়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত মানুষ হুট করে নিয়ে থাকেন। বিষয়টি এমন নয় যে, আত্মহত্যা করবার পূর্বে তিনি সে বিষয়ে চিন্তা করেন বা গঠনমূলক সিদ্ধান্ত নেন। জীবনে আসা বিভিন্ন অধ্যায়ের মধ্যে কিছু খারাপ অধ্যায় গ্রহণ করতে পারেন না।


অনেক বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ার কারণে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সেটা হতে পারে মানসিকভাবে চরম রকমের ধাক্কা খাওয়া, নিজ জীবন নিয়ে আশা-ই ছেড়ে দেওয়া, অথবা সামনে যাবার রাস্তা দেখতে না পাওয়া।


“অ্যামেরিকান ফাউন্ডেশন ফর সুইসাইড প্রেভেনশন” –এর মতে পৃথিবীতে যতগুলো আত্মহত্যা হয় তারমধ্যে অর্ধেক অংশে ডিপ্রেশন বা হতাশার চিহ্ন লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও আরো কিছু মানসিক সমস্যার কারণে আত্মহত্যা করতে দেখা যায়। সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো,


(ক) বাইপোলার ডিজ-অর্ডার

(খ) বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিজ-অর্ডার

(গ) ইটিং ডিজ-অর্ডার ও

(ঘ) সিজোফ্রেনিয়া


২. ট্রমাটিক স্ট্রেস

একজন মানুষের মধ্যে যদি কোন ধরণের ট্রমাটিক অভিজ্ঞতা থাকে তবে আত্মহত্যা করতে পারেন। এসবের মধ্যে আছে, শিশুকালে সেক্সুয়্যালি এবিউজ হওয়া, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে ট্রমা, ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতি, সম্পর্ক জটিলতা ইত্যাদি।


অ্যামেরিকার একটি সার্ভে দেখাচ্ছে, ২২% শতাংশ মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন কারণ তারা ধর্ষনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়া ২৩% শতাংশ মানুষ আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে থাকেন।


PTSD – Post Traumatic Stress Disorder এর কারণে আত্মহত্যার পরিমাণ আরো ঊর্ধমুখী হচ্ছে। কারণ ট্রমায় পড়লে ট্রমা থেকে বের হবার পরেও একসময় মানুষ চরম হতাশায় ভুগে থাকেন। এমনকি ট্রমা থেকে মুক্তি পেলেও এই শঙ্কা থেকেই যায়।


৩. নেশা এবং আবেগপ্রবণতা

যারা মাদকদ্রব্য গ্রহণ করেন বা অ্যালকোহল নিয়ে থাকেন তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায়। এসব মানুষ আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন। এছাড়া চাকুরী চলে গেলে বা সম্পর্ক ভেঙ্গে গেলেও আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এখন পূর্বে থেকেই যারা মানসিক সমস্যায় ভুগছেন তাদের জন্য এই প্রবণতা আরো বেশি।


৪. ক্ষতি বা ক্ষতি হবার ভয়

একজন ব্যক্তি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যদি তার মধ্যে ক্ষতি হওয়ার ভয় প্রবলভাবে কাজ করে। সম্ভাব্য যেসব ক্ষতির ভয়ের কথা ভেবে একজন মানুষ এই সিদ্ধান্ত নেন,


(ক) রেজাল্ট বা পরীক্ষায় খারাপ করা

(খ) জেলে যাবার জন্য বা জেলে যাবার ভয়

(গ) বুলিং (গালাগালি), শেমিং (লজ্জা ভীতি), মানহানি, সাইবার-বুলিং ইত্যাদি

(ঘ) আর্থিক সমস্যা

(ঙ) বন্ধুত্ব বা সম্পর্কের ভাঙন

(চ) চাকুরী চলে যাওয়া

(ছ) সেক্সুয়্যাল অরিয়েন্টেশন ও পরিবারের অসম্মতি

(জ) সামাজিক স্ট্যাটাস চলে যাবার ভয়


৫. নিরাশ হওয়া

বিভিন্ন স্টাডিতে বের হয়ে এসেছে যে, আশাহত হওয়া, ব্যর্থতা মানুষকে আত্মহত্যা নেবার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে। সেই মানুষটি হয়তো তার সমাজের কাছেই ভিক্টিম, বা শারীরিকভাবে বিভিন্ন কাজ করতে অক্ষম এবং সেটা থেকে বের হওয়ার আশাও একসময় নষ্ট হয়ে গেলে।


এছাড়াও, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা এবং অসুস্থতা, নিজেকে অন্যর জন্য অভিশাপ মনে করা, সামাজিকভাবে একঘরে করে দেওয়ার জন্য, সাহায্যের প্রার্থনা করেও সাহায্য না পাওয়া ইত্যাদি মোটাদাগে এই সব কারণে মানুষ আত্মহত্যার মতন ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।


আত্মহত্যার কারণ নিয়ে শেষকথা

আপনি হয়তো কোনভাবেই জানবেন না যে, একজন মানুষ কেন আত্মহত্যা করে থাকেন? বা কেন এই ধরণের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন! এমন মনে হতে পারে, উক্ত ব্যক্তির কাছে তো সব ছিলো তবুও কেন আত্মহত্যা করলেন? এর কারণ হলো, জীবনটাকে যেভাবে আপনি দেখছেন উক্ত ব্যক্তি সেভাবে জীবনকে দ্যাখেন নাই। আমাদের সবার চোখ আছে, কিন্তু লেন্স আলাদা আলাদা হতে বাধ্য। আমরা সবাই একে অপরের থেকে অনেক ভিন্ন।


কেন আত্মহত্যা করবেন না?

আত্মহত্যা করার জন্য অনেক কারণ দর্শাতে পারেন কিন্তু আত্মহত্যা না করারও অনেক কারণ আছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১০-১১ সেশনের শিক্ষার্থী ছিলেন ইশতিয়াক মাহমুদ। তিনি একটি ই-কমার্স “থলে.কম” এর কাছে ৪৭ লক্ষ ১৮ হাজার ৫০০ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হোন এবং সম্পর্কের জটিলতার কারণে আত্মহত্যা করেন।


আত্মহত্যা করার পূর্বে তিনি ফেসবুকে একটি নোট লিখে যান এবং সর্বশেষ আমরা জানতে পারি তিনি ফেসবুকে “বিদায় পৃথিবী” লিখে স্ট্যাটাস দিয়ে বিষপান করে আত্মহত্যা করেন।


শুধু তাই নয়, লাগাতার এই ধরণের আত্মহত্যা হয়েই চলেছে। কিন্তু এ বিষয়ে বিশদ কোনো আলোচনা কোথাও পেলাম না। একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, এই মানুষটি ছিলেন দায়িত্ববান। দায়িত্ববান না হলে কোন কিছু করবার চেষ্টা করতেন না অন্তত।


ঠিক এভাবে পৃথিবী থেকে যদি দায়িত্ববান মানুষেরা চলে যান তাহলে পৃথিবী হয়ে উঠবে অলসদের আবাস্থল। এবং ওমন পৃথিবীতে না জানি আমাদের কার কার সাথে সমস্যা সমাধানের জন্য ডিল করার প্রয়োজন পড়তে পারে!


যাইহোক, কতটুকু কাজে দিবে জানি না কিন্তু আমি একটি বিষয় আপনাদের সামনে আনছি। হতে পারে এই ধরণের বিষয় আপনার মাথায় আর আসবে না, এই ধরণের সিদ্ধান্ত আর আপনি নেবেন না।


আমাদের শরীর

আমার কাছে একটি শরীর আছে। তো আমি কি করতে পারি? আমার ইচ্ছে হলে আমি খাবার খেতে পারি, জল পান করতে পারি। আমার ইচ্ছে হলে আপনার সাথে কথাও বলতে পারবো। কীভাবে? আমার কাছে একটি শক্তিশালী মস্তিষ্ক আছে, যার মাধ্যমে আমি চিন্তা করতে পারি।


ধর্মীয় দিক থেকে দেখলে, ইসলামিক দর্শনেও আমরা আত্মার অবস্থান আছে বলে বিবেচনায় নিয়ে থাকি। আপনি চাইলে শরীরটাকে শেষ করে দিতে পারেন কিন্তু আত্মা কে বিনাশ করতে পারবেন না। চাই আপনি যত-ই চেষ্টা করুন না কেন।


এখন আপনি এমন একটি দুনিয়ার চিন্তা করুন যেখানে আপনার আত্মা তো আছে কিন্তু শরীর নেই। সেক্ষেত্রে হয়তো আপনি অনেক কিছু করতে চাইবেন কিন্তু কিছুই করতে পারবেন না। কারণ আপনার কাছে শুধু আত্মা আছে, শরীর নেই।

 

এই পৃথিবীটাকেই দেখুন না! এখানে কত বড় বড় বিল্ডিং, রাস্তা, পাহাড় কেটে সড়ক/রেললাইন আমরা বানিয়েছি। আমাদের শরীর এজন্য আমাদের সাহায্য করেছে। আমরা কৃত্রিম নদী বানিয়েছি, উড়োজাহাজে চড়ে আকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছি, ইন্টারনেটের মাধ্যমে জীবনটা কে আরো সহজ বানিয়েছি।


আমাদের ভবিষ্যত চিন্তা হলো, আমরা চাঁদে গিয়ে বসবাস করবো। এতকিছু আমরা করছি কীভাবে? কারণ আমাদের কাছে একটি শরীর আছে। আর এই শরীরে দুর্দান্ত একটি মস্তিষ্ক আছে, যা দিয়ে অনেক জটিল জটিল সমস্যারও সমাধান করা যায়।


অ্যাক্সিডেন্টে হাত বা পা কাটা গেছে এমন ব্যক্তি নিজেকে কেমন অনুভব করনে? অথবা শুধুমাত্র যার চোখ নেই? তিনি হয়তো একবার তার কাছের মানুষদের কে দেখবার জন্য প্রতিরাতে কাঁদছেন। হয়তো পরিবারের কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রণার মধ্যে দেখছেন এবং ইচ্ছেও হচ্ছে তাকে সাহায্য করবার কিন্তু হাত-পা কিছুই কাজ করছে না।