কীর্তিময় পূর্ব পুরুষগণের কীর্তি - এক পলকে সেরা বাঙালীদের তালিকা

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে তারাশংকর, বিভুতিভুষণ, মাণিক বন্দোপাধ্যায়, আশাপুর্না দেবী, বুদ্ধদেব বসু, সমরেশ বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, কাব্যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় - আজও হেমন্তের আলো সেই পোস্টম্যান ডাকবাক্সে রোজ রেখে যাচ্ছেন তাঁর পত্রবাণী - “মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও।”

কীর্তিময় পূর্ব পুরুষগণের কীর্তি - এক পলকে সেরা বাঙালীদের তালিকা
কীর্তিময় পূর্ব পুরুষগণের কীর্তি - এক পলকে সেরা বাঙালীদের তালিকা

ষোড়শ শতকে দেখি শ্রী চৈতন্য কে। জাতপাতের শত্রুবেড়া কে কি অবলীলায় গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন এই মহামানব। ব্রাহ্মণ ও চন্ডাল, ধর্মীয় বিধর্মী এমন সম্পূর্ণ বিপরীত দের একাসনে বসাতে ভয় পাননি, দ্বিধা করেন নি। আজকের ভাষায় তিনি মানস বিপ্লবের পথিকৃৎ।


সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের বাঙালীর ইতিহাস ততো স্পষ্ট নয়। আলোছায়ায় ঘেরা! বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায় “বাঙালীর ইতিহাস নাই” ।


ঐ দুটি শতক ছেড়ে এলে উনবিংশতি শতক বাঙালীর কীর্তিগাথায় আকাশ, বাতাস মুখরিত। এই শতকেই শ্রেষ্ঠ ধর্ম পুরুষ শ্রী রামকৃষ্ণ দেব - এক নিরক্ষর শিক্ষিতদের অসামান্য উচ্চ শিখরে উঠিয়েছিলেন – “যতো মত! তো পথ” ।


ধর্ম সম্পর্কে এমন ভাবে যখন উজ্জীবিত করছেন পরমহংস তার কিছু কিছু আগেই অর্থ সঞ্চয়ের নানা পথে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছেন জোড়াসাঁকোর প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর (১৭৯৪ – ১লা আগস্ট, ১৮৪৬) ।


জমিদারি, জলপথে ব্যবসা, খনির মালিকানা, সম্ভ্রান্ত বিপণির পত্তন এমন কি কালাপাণি পার হয়ে বিলেত যাত্রার দুঃসাহস দেখিয়েছেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। তাঁর ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্য এখনো এক ইতিহাস! রুপকথার মতো মুখ্য বিষ্ময়ে ভরপুর।


এঁর সমসাময়িক আরও দু’জন বাঙালি মিলিনেওয়ার রামদুলাল দে ও স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় কিংবদন্তী হিসেবে খ্যাত।


ধর্মে অগ্রণী, অর্থে প্রতিস্থিত হলেও বাঙালি পুরো তখনো যুক্তিবাদি, আধুনিক জীবনধারার শরিক হতে পারেনি। রেনেসাঁসের আলোয় কিছু বাঙালি আলোকিত হলেও বাঙালির জীবনে ছিল  অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুসংস্কার।


এক অনন্ধকার ঘুর্নিতে ঘুরপাকের সময় এক আলোক সামান্য পুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আবির্ভাব। বাঙালীকে টেনে তুললেন অনেকটা উপরে। তিনি শুধু মহাপন্ডিত কি মানবদরদী নন এক একক ব্যক্তিত্ব।


এই কল্যানকারী নির্মিত পথে বাঙালিকে আত্মজাগরণের মন্ত্রে দীক্ষিত করে তুললেন বিবেকানন্দ। বাঙালি যুবসমাজের তিনি রাজা। তাঁর আহ্ববানের ডাক কেউ উপেক্ষা করতে পারে নি।


স্বল্পপরিমিত জীবনে তিনি আইকন -এ পরিণত হয়েছিলেন। তিনি অলস, অকর্ম, মন্দভাষী, ঈর্ষাপরায়ণ, ভীরু, কলহ প্রিয় বাঙালির কঠোর নিন্দে করেছিলেন ঠিকই কিন্তু বাঙালীর শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গর্ব ছিল প্রখর।


উনিশ শতকের নয়া জাগৃতি বাঙালির প্রাচুর্য কেযে বাড়িয়েছিল তা শুধু নয় বিশ্বসাহিত্যের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। এই সময় অমরত্বের সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেছিলেন কাব্যে মাইকেল মধুসুদন, গদ্যে বঙ্কিমচন্দ্র। আরও অনেকে যুক্ত আছেন এই মহাসাধনায়, তবে এঁরা দুজন ছাপিয়ে আছেন।


মধুসুদন শুধু মহাকাব্য নয়। এক নতুন ধারা সাহিত্যের “সনেট” নির্মাণ করে গেছেন। গদ্য সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্রের ভূমিকা অগ্রপথিকের। তাঁর হাতেই বাংলা উপন্যাসের শিল্প-সৃস্টির পুর্নপ্রতিষ্ঠিত।


এই শতকের শেষ ভাগ হতে বিংশ শতকের মধ্যভাগ অবধি বাঙালির সাহিত্যে ও জীবনে প্রতীক পুরুষ রবীন্দ্রনাথ। একটি দীর্ঘস্থায়ী যুগ তাঁর নামেই চিহ্নিত। বস্তুতঃ বাঙালির শ্রেষ্ঠ প্রতিভার নাম রবীন্দ্র নাথ।


আমাদের জীবন যাপনে তিনি যে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন, তার তুলনা হাতে গোনা। রবীন্দ্রনাথে আজও বাঙালি ঋদ্ব।


সাহিত্যের সুত্রে মনে পড়বে অবশ্যই শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বাঙালির পারিবারিক জীবনের রুপকার ও কথক শরৎচন্দ্র। তাঁর জনপ্রিয়তা কে এখনো কেউ হার মানাতে পারেনি। আরও অনেক সাহিত্যকার এখানে নিরুচ্চারিত থেকে গেলেন, তাঁরাও কোন না কোন ভাবে সৃস্টির নিরিখে সেরা, অবিস্মরণীয়।


বিজ্ঞানসাধনায়, আবিস্কারের তপস্যায় জগদীশ চন্দ্র, প্রফুল্লচনন্দ্র থেকে সত্যন্দ্রনাথ বসু পর্যন্ত একটি রেখা টেনে আনলে দেখবো বাঙালি বৈজ্ঞানিকদের অবদান আপামর বাঙালির মাথা উঁচু করে রাখবার পক্ষে যথেষ্ট। এঁরা সবাই প্রবাদ প্রতিম।


বলতে গেলে জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে একাধিক সেরা বাঙালির সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়া আজ আর অসম্ভব নয়।


আমাদের গর্ব যে ভাষা, সেই ভাষা সাম্রাজ্যে সসন্মানে অধিষ্ঠিত আছেন সুনিতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে আশ্চর্য বন্ধন গগনেন্দ্র, অবনীন্দ্র, নন্দলাল বসু, গণেশ পাইন, বিকাশ ভট্টচার্য এক রং তুলির অপরুপ রুপকথা।


সেই যে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর স্বভাব সিদ্ধ পরিহাসে বলেছিলেন, “বাঙালি চিরকাল দুর্বল, ভীরু ঘুঁসি দেখিলেই পলাইয়া যায়, তাঁর এই জ্বলন্ত কশাঘাতের প্রতিবাদ মাস্টারদা সূর্য সেন, অনির্বান দেশপ্রেমিক সুভাষচন্দ্র বসু।


চিকিৎসা শাস্ত্রে ডঃ বিধানচন্দ্র প্রবাদ কেও যেন ছাড়িয়ে গিয়েছেন। অর্থনিতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বলেই নন, প্রজ্ঞা, মেধা চিন্তা চেতনারও এক শ্রেষ্ঠ বাঙালি।


বাংলা রঙ্গমঞ্চে যদি উনিশ শতকে গিরিশ চন্দ্র, বিনোদিনী দাসী শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পেয়ে থাকেন তাহলে বিশ শতকে শিশির কুমার ভাদুরী ও শম্ভু মিত্র অবিস্মরণীয়।


নৃত্যে উদয়শংকর, সেতারে রবিশংকর, কণ্ঠসংগীতে কিশোর কুমার, মান্না দে, সরোদে আলি আকবর খান বাঙালির মুখে মুখে। চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় বিশ্বসেরাদের একজন। তাঁর অবদানে বাঙলির গৌরব অম্লান।


রুপোলি পর্দার নায়ক উত্তম কুমার, তাঁর ছেড়ে যাওয়া জায়গা আজও রিক্ত হয়ে আছে। নায়িকা সুচিত্রা সেন এযাবৎ অদ্বিতিয়া মৃত্যু তাঁর জনপ্রিয়তার কাছে হার মেনেছে।


আধুনিক বাংলা সাহিত্যে তারাশংকর, বিভুতিভুষণ, মাণিক বন্দোপাধ্যায়, আশাপুর্না দেবী, বুদ্ধদেব বসু, সমরেশ বসু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, কাব্যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় - আজও হেমন্তের আলো সেই পোস্টম্যান ডাকবাক্সে রোজ রেখে যাচ্ছেন তাঁর পত্রবাণী - “মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও।”


ক্রীড়ানৈপুন্যে ফুটবলে গোষ্ঠ পাল হন যদি দুর্জর চীনের প্রাচীর, তবে চুনী গোস্বামী গ্রেট ব্যরিয়ার রিফ। ক্রিকেটে বিজয় পতাকা পংকজ রায়ের বহন করে ক্রিকেটের জন্মভুমি জয় করেছেন সৌরভ গাঙ্গুলি, আমাদের দাদা কলকাতার প্রিন্স। আর মানুষ কে জাদুবিদ্যার মায়াজলের বন্ধনে বেঁধেছেন জাদুকর পি. সি. সরকার।


অতএব বাঙালি এই পরিপুর্ন ভান্ডারটি বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে বলতেই পারেন- এতো সেরা মানুষ   ভারতীয় উপমহাদেশের আর কোনো জাতির আছে!


আরও পড়ুনঃ হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও মান্না দে: হৃদয়ে লেখা দুটি নাম