কী স্বাদের মধু আছে শিল্পী সমিতির নির্বাচনে?

গত কয়েক বছর হলো বাংলাদেশ চলচিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিশাল সংখ্যক মানুষের চরম আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। দেশের সার্বিক নীতি নির্ধারণ অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনে মানুষের মধ্যে যতটা না আগ্রহ থাকে তার চেয়ে বেশি আগ্রহ এখন দেখা যায় চলচিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনকে ঘিরে। কেনো এত আগ্রহ সেটি নিয়ে আজকের আলাপ।

কী স্বাদের মধু আছে শিল্পী সমিতির নির্বাচনে?
কী স্বাদের মধু আছে শিল্পী সমিতির নির্বাচনে?

একটি স্বাধীন দেশের বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের নানা ধরনের সংগঠন আছে। সংগঠন পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট গঠনতন্ত্র অনুসারে কাউন্সিল হয়ে থাকে। এটি বিভিন্ন ভাবে হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশি পরিচিত পদ্ধতি হলো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচন।


বর্তমানে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ‘নির্বাচন’ শব্দটি একটি নেতিবাচক শব্দ। সেটির আলোচনা না হয় থাক। তবে বিভিন্ন সংগঠনের নির্বাচনের আয়োজনে মানুষের মধ্যে খুব একটা আগ্রহ ও উত্তাপ দেখা যায় না।


কিন্তু গত কয়েক বছর হলো বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিশাল সংখ্যক মানুষের চরম আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। দেশের সার্বিক নীতি নির্ধারণ অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনে মানুষের মধ্যে যতটা না আগ্রহ থাকে তার চেয়ে বেশি আগ্রহ এখন দেখা যায় চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনকে ঘিরে।


কেনো এত আগ্রহ? সেটি নিয়ে আজকের এই অনুচ্ছেদে বিশ্লেষণ করে দেখবার চেষ্টা।


উপমহাদেশে চলচ্চিত্র সংগঠনের ইতিহাস

বাংলাদেশের অভিনয় জগতের শিল্পীদের পেশাগত স্বার্থ রক্ষার জন্য ১৯৮৪ সালে ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি’ গঠন করা হয়। তবে এর আগে এই উপমাহাদেশে প্রথম ১৯৩২ সালে গঠিত হয় একটি সংগঠন।


এরপর ১৯৩৮ সালে কলকাতায় চিত্র ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া ১৯৩৯ সালে কলকাতায় নিখিল বঙ্গ চলচ্চিত্র সংঘ নামে আরেকটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়।


পরবর্তীতে ১৯৫২ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ঢাকায় পূর্ববঙ্গ চলচ্চিত্র সমিতি নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়।


নির্বাচনের ইতিহাস

প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সংগঠনগুলো। তবে গত দুই বা তিন ট্রার্মের মত আগে কখনো দেশের মানুষের মাঝে এই সমিতির নির্বাচন নিয়ে এত আগ্রহ দেখা যায়নি।


আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্কের মধ্যে দিয়ে গত ২৮ জানুয়ারি এবারের বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির দ্বিবার্ষিক (২০২২-২০২৪)  নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।


নির্বাচনে সভাপতির পদে দর্শকপ্রিয় অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন সভাপতি হিসেবে বিজয়ী হলেও সাধারণ সম্পাদক পদে জায়েদ খান ও নিপুনের মধ্যে কেউই বৈধতা পায় নি।


নির্বাচনের ভোটের কয়েক দিন আগে থেকে ইলিয়াস কাঞ্চন-নিপুণ ও মিশা–জায়েদ প্যানেলের মধ্যে যে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল, ভোটের দিন সেই উত্তেজনা অনেক কম ছিল।


কাদা ছোঁড়াছুড়ি

তবে নিয়ম ভাঙার অভিযোগে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্যানেলের মধ্যে ছিল পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। নিপুণ তাঁর বিরোধী প্যানেলের জায়েদ খানের বিরুদ্ধে টাকা দিয়ে ভোট সংগ্রহের অভিযোগ করেন। এরপর জায়েদ খানও অভিযোগ নিয়ে আসেন নিপুণের বিরুদ্ধে। তিনি প্যানেলের একজন প্রার্থী টাকা দিয়ে ভোট সংগ্রহ করছেন।


তবে সেই সময় কিছুটা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। নিপুণ বিষয়টি একাধিকবার নির্বাচন কমিশনের নজরে আনলেও লোক পাঠিয়ে সেখান থেকে দুই প্যানেলের প্রার্থীদের সরিয়ে দেন। এমন নানা কারণে আগের সব নির্বাচনের ইতিহাসকে হার মানিয়েছে।


নির্বাচনকে ঘিরে দুই প্যানেল একে অপরের দিকে কাদা ছোঁড়াছুড়ি করেছে। শিল্পী সমিতির নির্বাচন পরবর্তী অবস্থা নিয়মিত নতুন নতুন মোড় নিয়েছে। চিত্রনায়ক জায়েদ খানের প্রার্থিতা বাতিল করে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনে আপিল বোর্ডের দেওয়া সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট।


এর আগে আপিল বোর্ডের প্রার্থিতা বাতিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আবেদন করেন জায়েদ খান। গত ৫ ফেব্রুয়ারি জায়েদ খানের প্রার্থিতা বাতিল করে নিপুণকে শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করে আপিল বোর্ড।


আপিল বোর্ডের চেয়ারম্যান সোহানুর রহমান সোহান এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এরপরই নিপুণ সাধারণ সম্পাদক পদে শপথ গ্রহণ করেন। তবে পরবর্তীতে সেটিও হাইকোর্ট আবার স্থগিত করেন।


এছাড়া নির্বাচনের সময় থেকে নিপুণ আচরণ বিধি লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে জায়েদ-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। তার একটি অভিযোগ হলো- জায়েদ খান টাকা দিয়ে ভোটার কিনেছেন। নিপুণের এই অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেছেন জায়েদ খান।


অন্য অভিযোগটিও গুরুতর। নিপুণের দাবি, ২৮ জানুয়ারি সকালে ভোটের মাঠে তাঁর পরিষদের দুই নারী প্রার্থীর সামনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার পীরজাদা শহীদুল হারুন তাঁর কাছে চুমুর আবদার করেন।


এছাড়া গত ১৭ জানুয়ারি দুপুরে মডেল ও অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধারের খবর দেশের সর্বত্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে দেয়। কারণ তিনি শিল্পী সমিতির ভোটাধিকার হারানো একজন।


এরইমধ্যে একদল অভিনেতা শিমু হত্যার সরাসরি অভিযোগের আঙ্গুল জায়েদ খানের দিকে তোলেন। অভিযোগ যে ভিত্তিহীন সেটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে জায়েদ ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হোন।


কারণ ঘটনার পর আসল বিষয়টি জানা যায়, সেটি হলো তার স্বামী সাখাওয়াত আলীম নোবেল তাকে হত্যা করেন।


নির্বাচনের ফলাফল

চলতি বছর নির্বাচনে মোট ভোট কাস্ট হয়েছে ৩৬৫। নির্বাচনের আগে আদালতের রায়ে ভোটাধিকার পাওয়া ১৮৪ জন শিল্পী শেষ পর্যন্ত ভোট দিতে পারেননি। যে পদটি নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে সেটি হলো সাধারণ সম্পাদক পদ।


কারণ নির্বাচন শেষে মধ্য রাতে জায়েদ খান বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু জায়েদ খান পেয়েছেন ১৭৬ ভোট, নিপুণ পেয়েছেন ১৬৩ ভোট। অতএব, দুজনে মিলে পেয়েছেন ৩৩৯ ভোট।


নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী ভোট কাস্ট হয়েছে ৩৬৫টি এবং ভোট বাতিল হয়েছে ১০টি। অর্থাৎ কার্যকরী ভোট: ৩৬৫-১০ = ৩৫৫টি। নিপুণ এবং জায়েদ খান মিলে মোট ৩৩৯ ভোট পেলে কার্যকরী ভোটের (৩৫৫-৩৩৯) ১৬টি ভোট কোথায়?


নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য এ প্রসঙ্গে জোরালো নয়। এই অল্প সংখ্যক ভোট গণনা করতে এত রাত কেনো হলো সেটি হলো মূল প্রশ্নের জায়গা। এ বিষয়ে প্রথম অভিযোগ তোলেন নিপুণ। সেটাকে অনেকইে সমর্থন করেছেন।


তবে এ ঘটনায় ইলিয়াস-নিপুণ প্যানেল সভাপতি ইলিয়াস কাঞ্চনের নীরবতা বিস্মিত করছে। অভিযোগের পরবর্তীতে নিপুনের পাশে ইলিয়াস কাঞ্চনকে দেখা যায়নি সেভাবে। কেউ কেউ বলছেন, এ নির্বাচনে প্রকৃত ‘নায়কে’র জয় হয়েছে।


নির্বাচনের আগ্রহের মূল বিষয়

দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। এটি অস্বীকার করার উপায় নাই। কারণ এখন আর প্রতি সপ্তাহে নতুন সিনেমা হলে হলে মুক্তি পায় না। দর্শকও আগের মত দল বেঁধে সিনেমা দেখতে যায় না। আবার অনেকে দেখতে ইচ্ছে করলেও হল নেই


সর্বশেষ কোন সিনেমা ব্যবসা সফল হয়েছে এটির নাম বলতে গেলে অনেক শিল্পী হোঁচট খাবেন। এসব নিয়ে আমাদের প্রযোজক, পরিচালক, নায়ক-নায়িকা, চরিত্রাভিনেতা, ভিলেন, চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত কারোরই তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ে না।


তবে এবার তাদের উৎসাহব্যঞ্জক তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। এই হঠাৎ জেগে ওঠার নানা কারণ আছে। তার মধ্যে অন্যতম বাণিজ্য পরিভাষায় ‘বিপণন ব্যবস্থাপনা’। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি গঠিত হয়েছিল প্রধানত চলচ্চিত্রাভিনয়ে যুক্ত সকলের পেশাগত সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে।


কিন্তু শুরু থেকেই সমিতি সেদিকে বিশেষ নজর দিতে পারেনি। বলা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমিতির ভূমিকা ছিল বিচারালয়ের মতো। আর নির্বাচিতদের অনেকেই বিচারকের মতো সদস্যদের শাস্তি ঘোষণা করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করেছেন।


পরিশেষ

তবে পেশাজীবনের কোনো বিষয় নিয়ে নয়, এবারের সংকট মনে হচ্ছে একেবারেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক। তবে খুব দ্রুত এসব সমস্যা থেকে বেরুতে না পারলে দেশের চলচ্চিত্রের অবস্থা আরো বেশি খারাপ হবে। সার্বিক বিবেচনায় শিল্প ও শিল্পীদের স্বার্থ নিয়ে কাজ জরুরী হয়ে পড়েছে।


আরও পড়ুনঃ নির্বাচন নাকি প্রহসন! তারও আগে জানুন প্রহসন বা ফার্স সম্পর্কে