খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.): পৃথিবীর শ্রেষ্টতম সেনাপতিদের মধ্যে অন্যতম

দুনিয়ার সর্বোচ্চ আসনে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) অধিষ্ঠিত হন তার সমরাস্ত্রের জ্ঞান, যুদ্ধ নীতি, যুদ্ধ চালানোর কৌশল, যুদ্ধের ময়দান ও তার আশপাশ এলাকা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ, শত্রুদের পর্যবেক্ষন ক্ষমতা, গুপ্তচর বা স্কাউটদের বিচক্ষণতার মাধ্যেমে প্রতিষ্ঠিত করার পদ্ধতির দ্বারা।

খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.): পৃথিবীর শ্রেষ্টতম সেনাপতিদের মধ্যে অন্যতম

আনুমানিক ৫৯২ খ্রিস্টাব্দে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা। তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশের বনু মাখজুম গোত্রের শেখ। রাসুলুল্লাহ (সা.) -এর সহধর্মিণী মায়মুনা বিনতে আল-হারিসের (রা.) চাচাত বোন ছিলেন খালিদের (রা.) মা লুবাবা আল-সুগরা বিনতে আল-হারিস।


মুসলিম বীর খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)

অশ্বারোহণ, বর্শা নিক্ষেপ, তীর-ধনুক ব্যবহার, তলোয়ার চালনায় দীক্ষা নিয়েছিলেন খালিদ (রা.) । তাঁর সব থেকে পছন্দের অস্ত্র ছিল বর্শা। তরুণ বয়সে তিনি যোদ্ধা ও কুস্তিগির হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমরের (রা.) মামাতো ভাই ছিলেন তিনি।


৬২৮ সালে হুদাইবিয়ার সন্ধির ফলে মুসলিম ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে দশ বছরের শান্তি স্থাপিত হয়। এ সময় খালিদ (রা.) ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। ৬২৯ সালের মে মাসে খালিদ (রা.) মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হন। তিনি ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে মদিনায় যেয়ে প্রিয় মুহাম্মদ (সা.) এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন।


অপরাজিত এক যোদ্ধা

মুসলিম বীর খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.) ছিলেন মুসলিম ইতিহাসে অপরাজিত এক যোদ্ধা। এই বীর যোদ্ধা রণক্ষেত্রে ইসলামের ঝান্ডাকে সমুন্নত রেখেছিলেন নিজের শক্তি ও মেধা দিয়ে। সামরিক নেতৃত্বের সব গুণাবলিই খালিদ (রা.)-এর মধ্যে ছিল।


বাহাদুরি, সাহসিকতা, উপস্থিত বুদ্ধি, তীক্ষ্ম মেধা, ক্ষিপ্রতা এবং শত্রুর ওপর অকল্পনীয় আঘাত হানার ব্যাপারে তিনি যে অদ্বিতীয় ছিলেন, এই কথা মিসরের খ্যাতনামা সাহিত্যিক ও ঐতিহাসিক আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ তার ‘আবকারিয়াতু খালিদ’ গ্রন্থে খালিদের (রা.) সম্পর্কে বলেন।


আন্দালিব আয়ান আজীবন এই বীরকে নিয়ে লিখেছেন।


সেনাপতি হিসেবে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) গাসানিদের বিরুদ্ধে অভিযানে জায়িদ ইবনে হারেসাকে (রা.) সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দেন। এবং পর্যায়ক্রমে যুদ্ধে তিনজন সেনাপতি শহীদ হলে খালিদ (রা.) কে সেনাপতি নির্বাচন করা হয়। মাত্র ৩ হাজার সৈনিক ছিল এ সময় তার অধীনে। অন্যদিকে ১০ হাজার সৈনিক বাইজেন্টাইন ও তাদের মিত্র গাসানি আরবদের ছিল।


খালিদ (রা.) কৌশল প্রয়োগ করে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের পরিস্থিতি থেকে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেন এই কঠিন পরিস্থিতিতেও। এই যুদ্ধের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, নয়টি তলোয়ার ভেঙে গিয়েছিল খালিদ (রা.) এর। এমন কৃতিত্বের জন্য রাসুল (সা.) তাকে সাইফুল্লাহ বা আল্লাহর তলোয়ার উপাধিতে ভূষিত করেন।


পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সেনাপতিদের মধ্যে অন্যতম

দুনিয়ার সর্বোচ্চ আসনে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) অধিষ্ঠিত হন তার সমরাস্ত্রের জ্ঞান, যুদ্ধ নীতি, যুদ্ধ চালানোর কৌশল, যুদ্ধের ময়দান ও তার আশপাশ এলাকা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ, শত্রুদের পর্যবেক্ষন ক্ষমতা, গুপ্তচর বা স্কাউটদের বিচক্ষণতার মাধ্যেমে প্রতিষ্ঠিত করার পদ্ধতির দ্বারা।


তিনি আজীবন অপরাজিত এক যোদ্ধা। তিনি পুরো সামরিক জীবনে মূল যুদ্ধ, ছোট খণ্ডযুদ্ধ, একক দ্বন্দ্বযুদ্ধ মিলিয়ে খালিদ প্রায় ১০০টির বেশি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন।


ইতিহাসবিদ আল তাবারির বক্তব্য অনুযায়ী, খালিদ (রা.) নিজে ঘুমাননি এবং অন্যদেরও ঘুমাতে দেন নি। কোনো কিছু তার কাছ থেকে গোপন করা যেত না। যুদ্ধের সময় তিনি গুপ্তচরদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতেন। এবং এজন্যই তিনি স্থানীয় লোকজনকে এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিতেন।


উমর খলিফা হওয়ার পর খালিদকে সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করেন। তবে এরপরও খালিদ আরব-বাইজেন্টাইন যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে একজন কার্যকর নেতা হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। তার নেতৃত্বে মুসলিমরা ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে দামেস্ক জয় করে।


৬৩৬ সালে ইয়ারমুকের যুদ্ধে মুসলিমরা গুরুত্বপূর্ণ বিজয় অর্জন করে। এর ফলে বিলাদ আল-শাম জয়ের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়। ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে খালিদ তার সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পান। তাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সেনাপতিদের মধ্যে অন্যতম বলা হয়। কারণ তিনি আজীবন একজন অপরাজেয় যোদ্ধা ছিলেন।


মৃত্যুবরণ

৬৪২ সালে খালিদ ইন্তেকাল করেন তার পদচ্যুতির চার বছর পর। তাকে এমেসায় দাফন করা হয়। সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর থেকে তিনি সেখানে বসবাস করছিলেন। খালিদ বিন ওয়ালিদ মসজিদের অংশ বর্তমানে তার মাজার।


আরও পড়ুনঃ হেলেন কেলার: এক শতাব্দী পরেও আমাদের অনুপ্রেরণা