গণপরিবহন ও ‘গা ঘেঁষে দাঁড়ানো’, যৌন নিপীড়ন বন্ধ হবে কবে?

গণপরিবহের মধ্যে বাসে সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হতে হয়। তবে হয়রানির স্থান হিসেবে বাস ও বাসস্টেশন দুটিকে উল্লেখ করেছেন সমীক্ষায় অংশ নেওয়া নারীরা। দুই জায়গা মিলে হয়রানির হারটা অবশ্য অনেক ৮৪.১০ শতাংশ। অন্যদিকে রেলস্টেশনে যৌন হয়রানি কম হয়। রেল ও রেলস্টেশনে এই হার ৪.৫৮ শতাংশ। আর রাইড শেয়ারিং সেবায় ১.৫৩ শতাংশ নারী হয়রানির শিকার হন।

গণপরিবহন ও ‘গা ঘেঁষে দাঁড়ানো’, যৌন নিপীড়ন বন্ধ হবে কবে?
গণপরিবহন ও 'গা ঘেঁষে দাঁড়ানো', যৌন নিপীড়ন বন্ধ হবে কবে?

মানুষ সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের চলাফেরা, বসবাস ও জীবনযাপনে নানা ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। প্রথম চাকা আবিস্কারের মধ্যে দিয়ে চলাফেরার এক যুগান্তকারী পরিবর্তন শুরু হয়। সর্বশেষ জেট বিমানের মাধ্যমে মুহুর্তের মধ্যে পৃথিবীর এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যেতে পারছে।


মানুষ সমাজের নানা মুখি বিবর্তনের অন্যতম একটি হলো নগরকেন্দ্রিকতা। বর্তমানে বিশ্বের প্রতিটি নগরে চলাচল সহজ করণের অন্যতম একটি মাধ্যম হলো বাস যোগাযোগ। এই বাসে সাধারণ সব ধরনের মানুষরা খুব সাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারে।


তবে সবকিছুর মধ্যে একটি গবেষণার তথ্য মানুষের সভ্যতার সব মুখোশ খুলে দেয়। সেটি হলো বাস নামক গণপরিবহনে নারীদের যৌন হয়রানির শিকার। সবশেষ বেসরকারি সংস্থা আঁচলের এক সমীক্ষায় ভয়াবহ এই তথ্য উঠে এসেছে।


সমীক্ষা অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের চেয়ে গণপরিবহনে নারীরা বেশি যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তবে বর্তমানের যুগ অনুযায়ী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হয়রানির পরিসংখ্যান বেশি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সমীক্ষা প্রকাশের পর সেটির ভিন্নতা দেখা যায়।


সমীক্ষায় দেশের এক হাজার ১৪ জন তরুণী অংশ নেন। যাদের মধ্যে গণপরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার হন ৬৪.৯২ শতাংশ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হয়রানির শিকার হন ৪৩.৮৯ শতাংশ নারী। গণপরিবহের মধ্যে বাসে সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হতে হয়।


তবে হয়রানির স্থান হিসেবে বাস ও বাসস্টেশন দুটিকে উল্লেখ করেছেন সমীক্ষায় অংশ নেওয়া নারীরা। দুই জায়গা মিলে হয়রানির হারটা অবশ্য অনেক ৮৪.১০ শতাংশ। অন্যদিকে রেলস্টেশনে যৌন হয়রানি কম হয়। রেল ও রেলস্টেশনে এই হার ৪.৫৮ শতাংশ। আর রাইড শেয়ারিং সেবায় ১.৫৩ শতাংশ নারী হয়রানির শিকার হন।


আরো জানা যায়, গণপরিবহনে ৬৪.৯২ শতাংশ যৌন হয়রানির মধ্যে আপত্তিকর স্পর্শের শিকার হন। ২০.০৪ শতাংশ কুদৃষ্টি এবং অনুসরণের শিকার হয়েছেন।
অন্যদিকে অনলাইনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৪৩.৮৯ শতাংশ নারী বিড়ম্বনার শিকার হন তার মধ্যে অবান্তর ও কুরুচিপূর্ণ বার্তা এবং বিব্রতকর মন্তব্যের শিকার হন ৬১.১২ শতাংশ।


সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আইডি হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছেন ১০.৩৪ শতাংশ। ৯.৮৯ শতাংশ ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল ছবি নিয়ে দুর্ভোগ পোহান বলে জানিয়েছেন। এছাড়া অন্যান্য ভাবে শিকার হন ৫.১৭ শতাংশ।


গণপরিবহনের এ অবস্থা প্রায় সবারই জানা। কারণ বিগত এক যুগের বেশি সময় এ বিষয়ে নানা সংস্থা গবেষণা করেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে বিভিন্ন সুপারিশ করার পরও সব সরকার এটি রোধের বিষয়ে কার্যকরী তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে নি।


এছাড়া বিভিন্ন সময় কিছু কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার কিন্তু সেটির কোনো কার্যকরীতা দেখা যায় নি। কারণ প্রতি বছর এ হয়রানির হার কমার পরিবর্তে বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে আরেকটি দিক হলো এমন ঘটনার শিকার হলে ভুক্তভোগীর আসলে কি করণীয় সেটি অনেকে জানেন না।


বাসে যৌন হয়রানির শিকার হলে তারা কি করেন এমন প্রশ্নের উত্তর একটি জরিপে দেখা যায় যে, হয়রানির শিকার হলে ৮১% চুপ করে থাকেন অথবা নিরবে তা সহ্য করেন এবং ৭৯ শতাংশ বলেছেন তারা আক্রান্ত হওয়ার স্থান থেকে সরে যান। অথবা না দেখার বা বুঝার ভান করে থাকেন।


বিগত বছরের কিছু ঘটনা

অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার সাময়িকভাবে স্বস্তি হয় ঠিকই, কিন্তু উদ্বেগ থেকে যায়। কেননা দেশের প্রচলিত আইন ও বিচার ব্যবস্থায় চরম জট রয়েছে। একটি অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে দীর্ঘ সময় লাগে। এছাড়া অনেক সময় আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যায় অভিযুক্তরা।


২০১৯ সালের ১০ আগস্ট রাতে চট্টগ্রাম মহানগরে চলন্ত বাসে এক গৃহবধূকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। এসময় নারীর চিৎকার শুনে পিছন থেকে একটি একটি ট্রাকের চালক বাসটির গতিরোধ করেন। এরপর স্থানীয় লোকজন বাসের চালক ও তার সহকারীকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পরে অবশ্য সেটি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত শাস্তি পান অভিযুক্তরা।


২০২১ সালের ১৫ নভেম্বর রাতে চট্টগ্রাম থেকে সিলেটগামী একটি নাইট কোচে তরুণীকে পর্ন ভিডিও দেখানো এবং উত্যক্ত করায় এক যুবককে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। একইসঙ্গে তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।


আসলে সবার জানার পরও এই রকম গুরুতর বিষয়ের কোনো সমাধান না হওয়ার কারণ সবাই জানতে চায়। এছাড়া এমন হওয়ার কারণই বা কী? সবার আগের যেটি বলা প্রয়োজন সেটি হলো এই সমস্যা চিহ্নিত করণের কোনো ভালো ব্যবস্থা না থাকা, অভিযুক্তকে চিহ্নিত করলেও আইনের প্রয়োগে দীর্ঘ পক্রিয়া হওয়ায় অনেক সময় কিছুই হয় না।


এছাড়া দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্মান করতে পারা। অন্যদিকে বিভিন্ন কারণে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ আগের চেয়ে বেশি যৌন হতাশাগ্রস্থ। এটি থেকে অর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বের হয়ে আসতে পারে। নিজেদের মধ্যে আরো বেশি সুন্দর, সুস্থ্য ও বৈধ যৌনতার বিষয়ে জ্ঞান লাভ করা।


এমন ঘটনা কমাতে কিছু সুপারিশ

১. গণপরিবহনে সিসি ক্যামেরা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।
২. সব ধরনের গণপরিবহনের স্টাফদের আলাদা আলাদা নেইম প্লেট ও পোষাক থাকা।
৩. জাতীয়ভাবে স্টাফদের একটি ডেটাবেজের আওয়াত নিয়ে আসা।
৪. গাড়ির ভিতরে নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের জরুরী দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থা করা।
৫. গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়ানো ও নারীদের জন্য বিশেষ কিছু পরিবহন ব্যবস্থা।
৬. বাস মিনিবাসে নারীর জন্য সংরক্ষিত আসন দরজার পাশে রাখা।
৭. গণপরিবহনে যৌন সহিংসতার বিচারের জন্য দ্রুত ট্রাইবুনাল গঠন।


হয়রানির শিকার হলে যা করবেন

৯৯৯ জরুরি সেবা বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে পরিচালিত একটি জরুরি কল সেন্টার। সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘন্টা চালু রয়েছে এ সেবা। দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে যে কোন ব্যক্তি ৯৯৯ -এ কল করার মাধ্যমে এ সকল জরুরি সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।


চলন্ত গাড়িতে যে কোন ধরনের যৌন নির্যাতন বা হয়রানির শিকার হলে সেই মুহুর্তেই ৯৯৯ এ কল করে অভিযোগ করতে পারবে। এটি খুব ফলপ্রসূ।


এছাড়া মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে রাত-দিন ২৪ ঘন্টা নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুকে সহায়তা প্রদান করা হয় টোল ফ্রি হেল্পলাইন ১০৯ থেকে। কেউ গণপরিবহন অথবা বাসে যাতায়াত কালে নির্যাতনের শিকার হলে এখানে জানাতে পারেন।


মেয়েদের জন্য সুরক্ষা অ্যাপ ‘বাঁচাও’

‘বাঁচাও’ অ্যাপ মূলত স্মার্ট ফোনের একটি অ্যাপ। এই অ্যাপের মাধ্যমে একজন নারী তার বিপদের সময় ‘বাঁচাও’ অ্যাপস ব্যবহারকারী সকলের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে। এক ক্লিকেই সাহায্য চাওয়া নারীর কাছাকাছি পরিবার, বন্ধু, স্বেচ্ছাসেবক ও পুলিশের কাছে চলে যাবে বার্তা।


জিপিএস বা গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাহয্য চাওয়া নারীর অবস্থান নির্দেশ করবে। এক্ষেত্রে তার নম্বর গোপন রেখে টেক্সট বা অডিও কলেও করা যাবে যোগাযোগ।


আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীর উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নে বিশেষ আইটি পার্ক