দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধির কারণ ও প্রতিকার

সাধারণত দ্রবমূল্যের দাম বৃদ্ধির তিনটা কারণে হয়ে থাকে। যেমন- ১. অপর্যাপ্ত উৎপাদন প্রক্রিয়া, ২. অসম বণ্টন ও ৩. অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটে বাজার দখল। এই তিন প্যারামিটারে আমরা দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধিকে ব্যাখ্যা করতে পারি।

দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধির কারণ ও প্রতিকার
দ্রবমূল্যের দাম বৃদ্ধির কারণ ও প্রতিকার

মানুষের স্বভাবিক জীবনযাপনের জন্য প্রতিদিন নানা ধরনের জিনিসের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে কিছু জিনিস নিয়মিত কিনতে হয়। যেগুলোকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বলা হয়ে থাকে। হঠাৎ করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পাওয়াই হলো দ্রবমূল্যের ঊর্ধ্বগতি।


ভোগান্তিতে সাধারণত নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষ

এমন হয় যে, আজকে বাজার করার পর একই জিনিস আগামীকাল একই দামে না পাওয়ার আশঙ্কা। এটির ফলে সবচেয়ে ভোগান্তির মধ্যে পড়ে সাধারণত নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের। যাদের আয় কোনোভাবে বৃদ্ধি পায় না।


তবে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়ে যায়। এই অসময় মূল্য বৃদ্ধি নানা কারণে হয়ে থাকে। তবে অল্প সময়ের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ না হলে সার্বিকভাবে দেশের জনসমষ্টির মধ্যে নেমে আসে দূর্ভোগ।


পৃথিবীব্যাপি অর্থনৈতিক মন্দা ও দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধির কারণ 

করোনাকালীন ও পরবর্তী সময়ে সারা পৃথিবীব্যাপি অর্থনৈতিক মন্দা ভাব দেখা দিয়েছে। কোভিড-১৯ এর সর্বশেষ ব্যাপ্তি ওমিক্রণ ছড়িয়ে যাওয়ার পর এখন মানুষের জীবনযাপন অনেকটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।


তবে এরই মধ্যে আবার প্রতিটি জিনিসের লাগামহীন মূল্য বৃদ্ধির ফলে মানুষেরা পড়েছে চরম অস্বস্তিতে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের মধ্যে চাল, ডাল, মাছ, মাংস, তেল, তরিতরকারি, ফলমূল, চিনি, লবণ, গম, আটা, রুটি, বিস্কুট ও গ্যাস সব কিছুর দাম আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে মেহনতি মানুষের অবস্থা নাভিশ্বাস উঠেছে।


সাধারণত দ্রবমূল্যের দাম বৃদ্ধির তিনটা কারণে হয়ে থাকে। যেমন- ১. অপর্যাপ্ত উৎপাদন প্রক্রিয়া, ২. অসময় বণ্টন ও ৩. অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটে বাজার দখল। এই তিন প্যারামিটারে আমরা দ্রবমূলের দাম বৃদ্ধিকে ব্যাখ্যা করতে পারি।


১. অপর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া হলে দেশে বিভিন্ন জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পায়

বাংলাদেশ বর্তমান খাদ্য উৎপাদনে আগের চেয়ে কয়েকগুণ স্বয়ংসম্পন্ন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভয়াবহভাবে বিঘ্নিত হয় কৃষির উৎপাদন। ফলে ১৯৭১-৭২ সালে দেশে খাদ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩০ লাখ টন। এটি ছিল মোট উৎপাদনের প্রায় ত্রিশ শতাংশ।


তবে গত ৫০ বছরে দেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩ শতাংশ হারে। ১৯৭০-৭১ সালে দেশে মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন ছিল এক কোটি ১০ লাখ টন। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চার কোটি ৫৩ লাখ টনে।


বর্তমানে চাল উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন ও উন্নয়নে বাংলাদেশের স্থান হলো সবার ওপরে। তা ছাড়া পাট উৎপাদনে বাংলাদেশের স্থান দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, চাষকৃত মৎস্য উৎপাদনে দ্বিতীয়, আম উৎপাদনে সপ্তম ও আলু উৎপাদনে অষ্টম বলে বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়।


স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে চালের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চার গুণ, গম দুই গুণ, ভুট্টা ১০ গুণ ও সবজির উৎপাদন বেড়েছে পাঁচ গুণ। খাদ্যশস্য, মাছ, ডিম ও মাংস উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন।


আলু উৎপাদনে উদ্বৃত্ত। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে আলু রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। তাহলে দেশে খাদ্য উৎপাদনের খুব একটা বেশি বৈষম্য নেই। তাই এই কারণ বর্তমান সমস্যার সাথে খুব একটা যুক্তিসঙ্গত নয়।


২. এবার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে অসম বণ্টনের দিকে আলোচনা করা যেতে পারে

এই কারণের আলোকে কিছু পণ্যের কথা বলা যেতে পারে। তার মধ্যে অন্যতম হলো বিভিন্ন সবজি ও চালের কথা। দেশের চাহিদার চেয়ে বেশি চাল উৎপন্ন হওয়ার পরও চালের দাম বৃদ্ধি কোনোভাবে আটকানো যাচ্ছে না।


এটির মূল কারণ হলো চালের একটি বড় অংশ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের হাতে জব্দ হয়ে থাকছে, যেটির বণ্টন চেইন তারা নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে করে তারা নিজেদের সর্বোচ্চ লাভের অংক দিয়ে বাজারে চাল বিক্রি করছে।


অন্যদিকে উত্তরাঞ্চলের মোকামতলা ও দক্ষিণাঞ্চলের বরিশালে সবচেয়ে বেশি সবজি উৎপাদন হয়ে থাকে। কিন্তু এই দুই অঞ্চলের চাষিরা যত কম পরিমাণ দামে মাঠ থেকে বিক্রি করেন। তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে ঢাকার ক্রেতারা সেটি ক্রয় করেন।


একটি সবজির দাম উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে, মোকামতলায় একটি ফুলকপির দাম সর্বোচ্চ৫-৭ টাকা দামে কৃষক বিক্রি করেন। কিন্তু সেটি ঢাকার খোলা বাজারে বিক্রি হয় সর্বনিম্ন ৩০-৩৫টাকায়।


এই মাঝখানে দাম বৃদ্ধির মূলে হলো বণ্টন পদ্ধতির সঠিক ব্যবহার না থাকা। ফলে দেশের বিভিন্নস্থানে উৎপাদিত পণ্যের বণ্টন ব্যবস্থা স্বচ্ছ করতে হবে।


৩. অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটে বাজার দখল এটি দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা

মূল এই কারণে সবচেয়ে বেশি দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের বড় বড় বাজারে ব্যবসায়ীদের একটি জোট তৈরি হয়েছে। যারা বিভিন্ন সময় পণ্য মজুদ করে কয়দিন পর উচ্চ মূল্যে সেটি বাজারে ছাড়েন ফলে হুট করে পণ্যে দাম বেড়ে যায়।


এটি দেশের প্রচলিত আইনের পরিপন্থী। কিন্তু সরকারও অনেক সময় এদের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। এই অবৈধ প্রক্রিয়ার নাম ব্যবসায়ীদের ভাষায় কার্টেল। এই প্রক্রিয়ার বিনাশই একমাত্র দ্রব্যমূলের দাম বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের মূল নিয়ামক।


বিগত ১০ বছর আগে ও বর্তমানে কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূলের অবস্থার ছোট্ট পরিসংখ্যান:

পণ্যের নাম সময় ২০০৯ ২০২১ বর্তমান
চাল ২১-২৩ ৪৪-৪৭ ৬০-৬৫
ডাল ১০৮-১১০ ১১০-১২০ ১৩০+
পেঁয়াজ ৪০-৪৪ ৫৫-৬০ ৬২+
সয়াবিন ৭০ ১৩০-১৪০ ১৭০+
চিনি ৫২-৫৪ ৭০-৭৫ ৭৫+
মাংস ২০০-২৫০ ৫০০-৫২০ ৫৫০-৬০০
মুরগি ১০০ ১৫০ ১৫৫-১৬০
মাছ ১৪০-১৬০ ১৮০-২০০ ২৩০-২৫০

সূত্র: ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)


গত কয়েক মাসে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম গত ১০ বছরে ১১ বার বৃদ্ধি পেয়েছে। যাতে খুচরা পর্যায়ে প্রায় ৯০ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া সাধারণ মানুষের জীবণযাত্রার ব্যয় ৬.৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।


রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও মুদ্রাস্ফীতি

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে পৃথিবীতে আরো বেশি মুদ্রাস্ফীতি ঘটতে পারে। এতে বাজারে আমদানিকৃত আরো কিছু পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় যেকোনো ভাবে বর্তমানে বাজারে দ্রব্যমূলের দাম স্থিতিশীল করতে হবে।


সেটির জন্য সবার আগে কার্টেল প্রক্রিয়া ও সেটির সাথে জড়ি সবার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্তে উৎপাদিত পণ্যের বণ্টন প্রক্রিয়া আরো সুষ্ঠ করতে হবে।


অন্যদিকে ট্রেডিং কর্পোরেশনের অব বাংলাদেশের মাধ্যমে দেশের সব জায়গায় ন্যায্য দামে পণ্য সরবরাহ করতে হবে। এটির ফলে বাজারে যেমন পণ্যের চাহিদা কিছুটা কম হবে তেমনি জিনিসপত্রের দাম স্থিতিশীল হবে।


এটি হলেই দেশের সর্বস্তরের মানুষের মঙ্গল হবে।


আরও পড়ুনঃ এত আত্মহত্যা কেন হচ্ছে! আমাদের করণীয় কী!