প্রেম-বৃষ্টির একান্তে – ছোটগল্প

প্রবল বৃষ্টিতে স্টীল উপনগর- মিনি কলকাতা ভিলাই জলমগ্ন প্রায়। আজই ভিলাই নিবাস কফি হাউসে দেখা করবার প্ল্যান তাই পালটায় তমা। সে ইন্দ্রকে বাড়ীতেই আসতে বলে। এরকম তারা আগেও করেছে। কলেজ, ইউনিভার্নিটিতে সহপাঠী, আজ তারা প্রেমের গাঁঠবন্ধনে বাঁধা কর্ম জগতেও সহকর্মী।

প্রেম-বৃষ্টির একান্তে – ছোটগল্প
প্রেম-বৃষ্টির একান্তে – ছোটগল্প

ইন্দ্র আসে কিছুক্ষণের মধ্যে। তার হাতে পদ্ম পাতায় মোড়া এক রাশ তাজা চাঁপা ফুল। তমা তো উচ্ছসিত এই উপহার পেয়ে। ভিজে যাওয়া ইন্দ্রকে একটা তোয়ালে এগিয়ে দিয়ে তমা বলে- মাথাটা মোছো ইন্দ্র, সর্দি হয়ে যাবে।


ইন্দ্র বলে, ‘তোমার জন্য আমি মরেও যেতে পারি, তমা।’


কি ব্যাপার আজ নীল! সম্ভোধনে ভদ্রতা! তুই থেকে তুমি তে উন্নীত! সে ইন্দ্রনীলের পুরো নাম যাতে ভুলে না যায় তাই মাঝে মাঝে ইন্দ্র কে “নীল” বলে ডাকে। ইন্দ্র বলে, ‘তুই তো আজ তুমি বললি! কেন!’


কি জানি, আর ভুলে যাওয়া যাচ্ছে না। প্রেমের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ সম্ভোধন, “তুমি” ।


আচ্ছা বল, কি খাবি এখন? কফি হাউস যাওয়া তো রদ্দ করে দিলাম - তার হাতে কফির মগ দিয়ে তমা বললো, তুই কি পারবি, আমি যা খেতে চাইবো তাই খাওয়াতে?


বলে দেখ- দেব ভোগ্য অমৃত সুধা ছাড়া আর সবই পারবো মনে হয়। যেটা সব সময় চাই, সেটা এখন নয়, তমা আমার, সেটা থাক রাতের জন্য।


- আবার ঐ সব ইন্দ্র?


- তা হলে এখন ব্রেকফাস্টে খাওয়া- ময়দার বানানো সাদা ফুলকো লুচি আর আলুর সাদা সাদা চচ্চড়ি।


হু, একটু খাটনির ব্যাপার অবশ্যই- তুই আমায় খানিক সাহায্য করবি আয় কিচেনে! ও, সিয়োর মাই কুইন ভিক্টোরিয়া- তব আদেশ শিরোধার্য। কি করিতে হইবে? মোর প্রিয়তমা তমা? ময়দা মর্দন না আলু কর্তন?


আলু কর্তন? হো হো হো


হেসে উঠলো তমা জোরে- কোনোদিন জীবনে করেছিস? শোন এই চেয়ারটায় বসে আমার সাথে গল্প কর শুধু- আর কিছু করতে হবে না। তমার খাবার ঘরটা বেশ বড়। কিচেন কাম ডাইনিং কাম স্টোর রুম। সেইভাবেই প্ল্যান করে বানানো। গ্যাস ওভেন থেকে রুটি সেঁকেই ডাইনিং টেবিলে টপ করে প্লেটে ফেলার ব্যবস্থা!


তমার মা, বাবা থাকেন রায়পুরে। তমা একমাত্র সন্তান। সে শখ করে কাজের সুবিধের জন্য এখানে থাকে। ঘন্টাখানেক পর লুচি, আলু চচ্চড়ি খেয়ে তারা ব্যালকনিতে বসে বাইরের ঝিরিঝিরি বৃস্টি দেখতে লাগলো।


কিছু পরে তমা বলে- নীল, তোর সৎমা তোকে কেয়ার করতেন রে? সেই সুযোগ টা তেমন হয় নি, প্রাথমিক পেরুবার পরই বাবা হস্টেলে পাঠিয়েছিলেন। আমি তখন থেকেই শেকর বিচ্ছিন্ন। ছুটিতে অন্যরা বাড়ী যাবার জন্য উদগ্রীব।আমি নই।গেলে মনে হত অন্য লোকের বাড়ি নিমত্রণে গেছি।


- আর বাবা?


আমরা গ্রামের ছেলে। সেই করিমপুর সীমান্তে কাছে বাড়ী। সেখানে তখন কার ছেলে মেয়েদের ভালোবাসা, আদর মানে আদিখ্যেতা। বরং পিটিয়ে শাষন টাই ছিল স্বাভাবিক। তাই বাবা কখনো বাড়তি কিছু দেখাননি।


আর আমি বরাবরই বাইরে থেকেছি তাই সম্পর্কটা কখনো গভীর হয়নি। ভালো কি বাসেন না, নিশ্চয় বাসেন, তবে প্রকাভঙ্গী সবারই আলাদা।


চান ঘর থ ঢিলেঢালা প্যান্ট পরে নিয়েছিলো ইন্দ্র, এখন সে একটা চেয়ারে বসে আর একটা চেয়ারে পা তুলে দিয়েছে। শরীরে এখন একটু ক্লান্তির ছাপ।


ইন্দ্র একজন গবেষক। তার সহকারিনী তমা। তমা শুনতে পেল ইন্দ্র বলছে- আমি বলে দিয়েছি সম্পত্তির ভাগ চাই না। ভাইরা তাতে খুব খুশী। আমি যখন যাই ধুতি, শাড়ী নিয়ে যাই, মাসে মাসে কিছু পাঠাই। বাবা তো এখন বেশ অথর্ব হয়ে পড়েছেন।


- আর মা কি বলেন?


- বলেন বিয়েটা এবার করলে তো হয়।


- তা, মা পাত্রি কি দেখছেন?


- পাগল, দেখলে তো ধরে আনতেন কোন পুঁটির, মাথায় বড় ঘোমটা!


- তোমার পুঁটির মা-ই দরকার!


- আমার কাউকেই দরকার নেই।


- ঠিক ভেবে বলছো ইন্দ্র?


- তোমার মনে নেই তমা, অবুঝমারের আদিবাসীদের জঙ্গলে গবেষণা পেপারের তথ্য খুঁজতে গিয়ে কি বলেছিলাম?


- কি বলেছিলে?


- বলেছিলাম, ২৬ জন ফিরিয়ে দিয়েছে, এবার না হয় ২৭ জন হবে, আমার ঝোলা তো বাঁধাই আছে। অতো সহজ নয় নীল, সেই করিম পুরে গিয়ে তোমার মাকে প্রণাম করে বলবো- আমি পুঁটির মা।


- যাচ্চলে! পুঁটিটা কই?


- আসবে, আসবে সময় হোক, পুঁটি, কই, রুই, কাতলা, হাঁঙ্গর, তিমি সব আসবে। এসে ২৬ জনের হিসেব চাইবে।


- আমি বলবো অডিট চলছে।


- অডিটই তো চলছে ইতিহাস বাবু, আমি যদও বলি ঐ ন ২৬ বন্দরে আমার নৌকা থামাতে আমার দশটা বছর কেটে গেলো।


- তমা, আমাদের বাড়ীর লোকেরা গ্রামে থাকে, এতো কথা বুঝবে না।


- আমি ধরে ধরে তোমার মাকে বলবো বলবো জশপুর নগরে আপনার এক পুত্রবধু আছে।


- তখন তিনি কি তোমায় বরণ করে নেবেন?


- বলবো অম্বিকাপুরে একটা শাখা খোলা হচ্ছে।


- আহ! অম্বিকাপুর আবার কোথা থেকে এল! ওখানে তো আমি যাইনি কখনো!


- তার মানে বাকী জায়গার গল্প আছে?


- ও তো মাটির গল্প।


- নিম্নচাপের অকাল বর্ষনে মাটি তো ঝুরঝুর করে কাদা হয়ে যাচ্ছে ইন্দ্র স্যর!


- কাদাই তো সার!


- কাদা তো কলঙ্ক স্যার!


- আ রে না রে বাবা ওটা আমার গবেষণা।


- তুমি তোতলাচ্ছো কেন?


- কো - কোথায়?


- ক’টা বিয়ে করেছো তুমি নীল?


- একটাও না রে!


- আচ্ছা, একটাও না!


- সত্যি বলছি, মাটি ছুঁয়ে বলবো?


- কিন্তু আমি যে জানি তুমি একটা বিয়ে করেছো!


- কবে, কোথায়, কিযে সব বলো না তুমি তমা!


তমা মুখ গম্ভীর করে উঠে যায়। গিয়ে দাঁড়ায় ইন্দ্রের চেয়ারের পেছনে। তারপর দু হাতে গভীর ভাবে জড়িয়ে ধরে ইন্দ্র কে। কানের কাছে মুখ নিয়ে কানে ঠোঁট ঠেকিয়ে প্রশ্ন করে-মনে নেই, অবুঝ মারের জঙ্গলের বিশ্রাম গৃহে তুমি গভীর রাতে ঠোঁটে ঠোঁট ঠেকিয়ে একজন কে বিয়ে করেছিলে!


ইন্দ্র তার হাত দিয়ে তমা কে সামনে এনে বলে- না গো তমা ম্যাডাম, ওটাকে বিয়ে বলে না। তমা ফের তার কানে ঠোঁট ঠেকিয়ে বলে- ওটা বিয়ে নয় কেন ইন্দ্র স্যর?


- আরে, ওটা তো একটা পেতনি ছিলো, অতো রাতে মানুষ পাওয়া যায়?


- তমা এবার সামনে এসে ইন্দ্রের চুল টেনে ধরে বলে- আমি এখন পেতনি?


ইন্দ্র তার হাত টায় একটা চুমু দিয়ে বলে- আমার তো পেতনিই চাই রে মুখ পুরী, জানিস না? সেই জন্যই আগের ২৬ টা ভোকাটটা হয়ে গেছে, সেই জন্যই অবুঝমারের ভুত খুঁজে পায় পেতনিকে। তমা এসে বসলো এবার ইন্দ্রের গা ঘেঁসে। হাতে হাত ধরে।


বাইরে বৃষ্টি কখনো বাড়লো, কখনো ধরলো, কখনো কমলো, কখনো গতি কমালো, বাড়ালো। সঙ্গে বাড়লো বেলা। নীল, এবারে কি খাবি বল? দুপুর তো গড়ালো!


আর কি! এই ওয়েদারে খিচুড়িই বেস্ট। চল কিচেনে আবার কি হেল্প চাই বল? দুজনে তারা কিচেনে এলো। ইন্দ্র কিছুই না বলে একটা চেয়ারে বসে তমার কাজ মুগ্ধ চোখে দেখতে লাগলো। তমা চাল বার করলো, ডাল বার করলো, গ্যাস জ্বালালো, মুগ ডাল ভাজতে চড়ালো, চাল ধুয়ে জল ঝরাতে লাগলো।


কথা কিন্তু তাদের থেমে নেই। অবিশ্রাম কথাা- তার মধ্যে ইন্দ্র আবার উঠে ঝুল বারান্দা থেকে বৃস্টি দেখে এলো- বৃস্টির খুব তোড় রে তমা আবার চেয়ারে বসলো, আবার কথা হারালো ঘড়ির কাঁটায়।


খিচুড়ি ও পাঁপড় ভাজা। এই সাধারণ খাবার এতো স্বর্গীয় মনে হলো। কখনো স্মৃতি চারণে কোনো কঠিন কথায় তমার চোখে জল এলো কখনো জীবনের ভালো বাসার ছোঁয়া না থাকার এক ঘটনা মনে পড়লো ইন্দ্রের, খাওয়ার টেবিলে হাত শুকিয়ে গেল, কথার নদী শুকোলো না।


ইন্দ্র হাত ধুয়ে এক গলা তৃপ্তি নিয়ে বললো-কি ভালো রেঁধেছ পুঁটির মা! তমা বললো- তবে এবারে পুঁটিকে স্কুল থেকে নিয়ে এসো। এই খুনসুটিতে তারা আবার কথায় ডুবে গেল,শব্দের অটটালিকা তৈরী হতে লাগলো।


ইন্দ্র একটা হাই তুলে বললো- আমার খুব ঘুম পাচ্ছে রে যা পেট ঠেসে খাইয়েছিস! তমা ঠেলে ইন্দ্র কে ওই ঘরে পাঠালো, ইন্দ্রর আপত্তি কে উড়িয়ে দিয়ে বললো- টুক করে একটু ঘুমিয়ে নাও। তারপর বৃষ্টি থেমে গেলে আমরা সামনের রাস্তায় বেড়িয়ে আসবো।


ইন্দ্র বললো- কি করে? রাস্তা তো ডুবে গেছে! তমা অহংকারে বলে- আমাদের নেহরুনগরের রাস্তা কখনো ডোবে না, জলই জমে না। তমা ইন্দ্রের চোখ নিজের হাত দিয়ে বন্ধ করে দিয়ে বলে- ঘুমোও সোনা।


ইন্দ্র তমার হাত সরিয়ে তমার দিকে চেয়ে থাকলো। চোখ খুলোনা নীল, আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দি! তমার হাত ইন্দ্রের মাথা থেকে নেমে আসলো কপালে, নাকে, গালে। তমা টের পেলো উষ্ণ শোনিত যেন, বাইরে বৃষ্টি অঝোর ধারায়, এই শোনিত ইন্দ্রের চোখের অগ্নি তান্ডব!


ঘরের কোণে তমার নজর গেলো ছোটো টেবিলে- আধফোটা স্বর্নচাঁপা তখন প্রস্ফুটিত হয়েছে।


পরের দিন

সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখলো করবী গাছ থেকে বৃষ্টির জল পড়ছে। তার মনে পড়লো, এই ঘরে গতকাল তারা কত সুখপ্রবাহে দিন কাটিয়েছে! কথা বলছে কত! তার পর কি হলো! প্রায় সন্ধের সময় ঘুম থেকে উঠে ইন্দ্র বললো- আমায় যেতে হবে তমা। আকাশগঙ্গায় সেমিনার আছে, থাকতেই হবে, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে মনে পড়লো।


এই রাতে তুমি ওই উঁচুতে উঠবে? হোটেল বুকিং আছে? চিন্তা করো না, আমার প্ল্যান, প্রোগ্রাম করে যাতায়াত করা হয় না জানো তো? বিষণ্ণ হয়ে তমা বললো- আমি তোমার সহকর্মী, গবেষক তো আমিও। আমায় নাও সঙ্গে।


তাকে জড়িয়ে ধরে ইন্দ্র বলে- এর পরের বার তোমায় সঙ্গে নেব পুঁটির মা, রাণী আমার মন খারাপ করো না, যে সংসারে বয়লার এখানে আর চিমনি ওখানে সেখানে এমন ব্যাঘাত তো হবেই।


রেডি হয়ে ইন্দ্রনীল রওনা হয়ে গেলো। এই প্রথম বার তার নিজেকে এতো একা মনে হলো। এই প্রথম সাত সকালের আলোয় সে দেখতে পেলো অমাবস্যার ছায়া!


আরো পড়ুনঃ স্টার্ট-আপ: আমার বন্ধু আবরার