'বঙ্গবন্ধু-১' মহাকাশে, সমালোচনাকে পেছনে ফেলে ই-সেবার উন্নয়ন

 বাংলাদেশের পতাকার রঙ লাল-সবুজের আবরনের মধ্যে লেখা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ প্রথম ভূস্থির যোগাযোগ ও সম্প্রচার উপগ্রহ। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ২০১৮ সালের ১১ মে স্পেসএক্স ফ্যালকন ৯ রকেটের মাধ্যমে মহাকাশে নিজস্ব কৃত্রিক উপগ্রহ স্থাপন করার গৌরব অর্জন করেছে। এটির মধ্যে দিয়ে বিশ্বের ৫৭ তম দেশ হিসেবে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপনকারীদের তালিকায় যুক্ত হলাম আমরা। এটির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের সার্বিক অর্থনীতির চাকা আরো একটু গতিশীল হবে।

'বঙ্গবন্ধু-১' মহাকাশে, সমালোচনাকে পেছনে ফেলে ই-সেবার উন্নয়ন
'বঙ্গবন্ধু-১' মহাকাশে, সমালোচনাকে পেছনে ফেলে ই-সেবার উন্নয়ন

তথ্য ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ব এখন অনেক এগিয়ে গেছে। বিশ্বের সাথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে  ডিজিটাল প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ২০২১ সালের মধ্যে একটি মধ্যম আয়ের দেশ এবং তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ার নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা করে বর্তমান ক্ষমতাশীন আওয়ামী লীগ।


এ লক্ষ্যে নিয়ে ৬ জানুয়ারি ২০০৯ শেখ হাসিনা বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো শপথ নেন। বাংলাদেশের পতাকার রঙ লাল-সবুজের আবরনের মধ্যে লেখা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ প্রথম ভূস্থির যোগাযোগ ও সম্প্রচার উপগ্রহ।


দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ২০১৮ সালের ১১ মে স্পেসএক্স ফ্যালকন ৯ রকেটের মাধ্যমে মহাকাশে নিজস্ব কৃত্রিক উপগ্রহ স্থাপন করার গৌরব অর্জন করেছে। এটির মধ্যে দিয়ে বিশ্বের ৫৭ তম দেশ হিসেবে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপনকারীদের তালিকায় যুক্ত হলাম আমরা।


এটির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের সার্বিক অর্থনীতির চাকা আরো একটু গতিশীল হবে। এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের প্রকৃতিক দূর্যোগের পূবাভাস পাওয়া যাবে। তবে উৎপক্ষের পরও এখনো পরিপূর্ণ সেবা থেকে আমরা কিছুটা বঞ্চিত হচ্ছি।


স্যাটেলাইট তৈরীর ইতিহাস

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়ে ১৪ জুন ১৯৭৫ সালের রাঙ্গামাটিতে দেশের প্রথম ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করে। পরবর্তীতে গাজিপুরের তালিবাবাদ ও ঢাকার মহাখালিতে এটি স্থাপন করা হয়। এর পর স্যাটেলাইট উৎক্ষেপনের বিষয়ে আলোচনা শুরু হলে ১৯৯৮ সালে এ সংক্রন্ত একটি কমিটি গঠন করা হয়।


এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে বাংলাদেশের টেলিকমিনেকশন্স কোম্পানি লিমিটেড এর একজন কর্মকর্তাকে ফ্রান্সে পাঠানো হয়। কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর লক্ষে ২০০৮ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ সংস্থা একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির সদস্যরা স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষে কাজ শুরু করেন।


২০০৯ সালে বাংলাদেশের জাতীয় তথ্য প্রযুক্তি নীতিমালায় রাষ্ট্রীয় কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ বিষয়টি সংযুক্ত করা হয়। আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেঢশন ইউনিট এর সাথে যোগাযোগ করা হয় বাংলাদেশের নিজস্ব কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের জন্য।


বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইট এর নকশা তৈরির জন্য ২০১২ সালের মার্চে প্রকল্পের মূল পরামর্শক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল কে নিয়োগ দেয়া হয়। বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইট কিনতে ফ্রান্সের স্যাটেলাইট নির্মাতা কোম্পানি থ্যালেস আলোনিয়া স্পেসের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় বাংলাদেশ।


অরবিটাল স্লট বা কক্ষপথ কেনার জন্য রাশিয়ার উপগ্রহ কোম্পানি ইন্টারেস্ট বুটলিকের সঙ্গে চুক্তি করা হয় ২০১৫ সালে। ২০১৭ সালে স্যাটেলাইটের সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড নামক একটি সংস্থা গঠন করা হয়।


তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান রাশিয়া) ১৯৫৭ সালে ইতিহাসের প্রথম বিশ্বের মধ্যে কৃতিম উপগ্রহ (স্পুটনিক - ১) প্রেরণ করে মহাকাশে। এটির মাধ্যমে তারবিহীর যোগাযোগ ও আবহওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া যায়।


এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃত্রিম উপগ্রহের অধিকারী বিশ্বের ৫৭তম দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে। উপগ্রহটি থেকে সার্ক দেশগুলোর পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান এবং কাজাকিস্তানের একটি অংশ এর সুযোগ নিতে পারবে।


এসব অঞ্চলে থাকা বিভিন্ন দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি ৪২টি টিভি চ্যানেল এবং রেডিও স্যাটেলাইটটির ব্যবহার করছে পূর্ণমাত্রায়।


সুবিধা

প্রথম উপ-গ্রহের মাধ্যমে দেশের সকল সামরিক বাহিনীগুলো নিজেদের মধ্যে নিরাপদে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারছে। এতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো আরো নিরাপদ ভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে। নিজস্ব স্যাটেলাইট ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিধি বিপুল অংশে বৃদ্ধি পেয়েছে।


দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যারা বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট ব্যবহার করে দেশ এবং দেশের বাইরে নিজস্ব যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করতে সক্ষম। প্রত্যন্ত অঞ্চলের টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেটের বিস্তৃতীর পথ আরো সুগোম হলো।


ই-সেবার উন্নয়ন

নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকার ফলে টেলিমেডিসিন, ই-লানিং, ই-রিসার্চ, ভিডিও কনফারেন্সিং, প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সব ক্ষেত্রেই আগের চেয়ে অনেক গতিশীল করা যাবে। এতে আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধা পাবো।


আগে অনেক সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের অবস্থান জানার জন্য আমাদের অন্যদেশের বিভিন্ন সংস্থার কাছে ধন্যা দিতে হতো ছবি নেওয়ার জন্য। কিন্তু নিজেদের স্যাটেলাইট থাকার ফলে ইচ্ছে মত যে কোন সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের অবস্থান জানার জন্য ছবি নিতে পারবো।


এতে ছবিগুলো বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করার সুযোগ থাকবে। সে অনুযায়ী আবহওয়ার পূর্বাভাস নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব। এতে উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীভনযাত্রার মান আগের চেয়ে অনেক উন্নত হবে।


যোগাযোগ ও অনুসন্ধান

জলপথে ও পাহাড়ী দূর্গোম পথে যোগাযোগের জন্য বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। বিশেষ করে জলপথে জাহাজ চলাচলের জন্য অনেক সময় গ্লোবাল পজেশানিং সিস্টেম মেকিং করতে। মাটি বা পানির নিচে ও গভীয় সমুদ্রে অনুসন্ধান করতে অনন্য ভূমিকা পালন করবে।


দুর্গম জায়গায় শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরীর ক্ষেত্রে বেশ কাজে আসবে এই স্যাটেলাইট। এছাড়াও তেল, গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানেও গভীর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে এটি।


মহাকাশ গবেষণা

দেশের অনেক শিক্ষার্থীর মহাকাশ গবেষণার ইচ্ছে থাকলেও যান্ত্রিক সুবিধা না থাকার কারণে সে স্বপ্ন অনেকের মারা যেতো। তবে খুব কম সংখ্যাক শিক্ষার্থী বিদেশে গিয়ে মহাকাশ নিয়ে গবেষনার সুযোগ পেতো। এতে দেশের তরুণ প্রজন্ম গবেষণা বিমুখ হয়ে ঝড়ে পড়তো। কিন্তু নিজেদের সফল স্যাটেলাইট উৎক্ষেপনের ফলে তারা বিশাল এক মহাকাশ গবেষণার সুযোগ পাবে।


বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশের বিভিন্ন মিডিয়া সংস্থা বর্তমানে বঙ্গবন্ধু -১ স্যাটেলাইট থেকে ভাড়া নেয়া ট্রান্সপন্ডার ব্যবহার করছে। দেশগুলো হলো হন্ডুরাস ও দক্ষিণ অফ্রিকা ভিত্তিক ২টি বেসরকারি টিভি চ্যানেল, তুরস্ক, ফিলিপাইন, ঘানা ও ক্যামেরুনের ১টি করে বেসরকারি টিভি চ্যানেল।


বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট থেকে ট্রান্সপন্ডার কিনেছে। বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের তথ্য অনুসারে বাংলাদেশ আগামী নয় বছরে এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ থেকে শুরু করে পরিচালনা ব্যয় তুলে আনতে সক্ষম হবে।


অর্থনৈতিক উন্নয়ন

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সফলভাবে উৎক্ষেপনের ফলে দেশের টেলিকনিকেশন্স, টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হলো। একই সাথে ইন্টারনেটের নিরবিচ্ছিন যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে নিজস্ব কৃতিম উপগ্রহ।


স্যাটেলাইট উৎক্ষেপনের আগে ভারত সহ অন্য দেশের উপর আমাদের নির্ভর করতে হতো ফ্রিকুয়েন্সি কেনার জন্য। তাতে প্রায় ১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মত খরচ করতে হতো। বর্তমানে নিজস্ব স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নিজ দেশের সকল টিভি চ্যানেল ও নেটওয়ার্ক সংস্থাগুলো অনেক শক্তিশালী ফ্রিকুয়েন্সি ব্যবহার করতে পারবে।


এতে করে বিদেশে আর কোন অর্থ যেমন দিতে হবে না। বরং এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমরা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবো। যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন একটি খাত। সঠিক ভাবে এটির ব্যবহার করতে পারলে আমরা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভবনা আছে।


পরিশেষ

একবিংশ শতাব্দীতে দেশের জন্য সবচেয়ে বড় একটি অর্জন হলো সফল স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন। এতে দেশের সকল ক্ষেত্রের যোগাযোগ ব্যবস্থার এক যুগান্তরকারী উন্নয়ন ঘটবে। আর যোগাযোগের উন্নয়নের ফলে দেশের অর্থনীতির চাকা আরো গতিশীল হবে।


সঠিকভাবে এটির ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা উন্নত দেশের মত সকল সেবা উপভোগ করতে পারবো। সার্বিকভাবে এটি দেশের জনগনের জীবনযাত্রার মানে বেশ পরিবর্তন নিয়ে আসছে।


আরও পড়ুনঃ বেড়েই চলেছে শিক্ষিত বেকারদের সংখ্যা এবং আমাদের পরিকল্পনাহীনতা