বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের যাত্রার আদ্যপ্রান্ত

বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে যতটা না পরিচিত তার থেকে অনেক বেশি পরিচিত গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিতে উন্নত বলে। প্রতিবছর আমাদের দেশের পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ পরিবার এই গার্মেন্টস শিল্পের উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে।

বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের যাত্রার আদ্যপ্রান্ত
বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের যাত্রার আদ্যপ্রান্ত

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। তবে এদেশে শিল্পের তেমন বিকাশ ঘটেনি। বাংলাদেশে যেসকল হাতেগোনা শিল্পের বিকাশ ঘটেছে তার মধ্যে পোশাক শিল্প বা গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি অন্যতম। রপ্তানি বাণিজ্যে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বিশাল অবস্থা রয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্প হচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির অনেক বড় একটি খাত।


পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে ২য়

পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ এর অবস্থান সারা বিশ্বে ২য়। তবে এই অবস্থানে বাংলাদেশ এক দিনে আসেনি। এই অবস্থানে আসার পেছনে রয়েছে গার্মেন্টস কোম্পানিগুলোর চেষ্টা, শ্রম এবং ২৬০+ বছরের ইতিহাস। বস্ত্র মানুষের ৫টি মৌলিক চাহিদার মধ্যে একটি।


অন্ন ছাড়া যেমন বেঁচে থাকা সম্ভব না, তেমনভাবেই বস্ত্র ছাড়াও সুশীল সমাজে বসবাস করা সম্ভব না।


পোশাকের ব্যবহার শুরু

প্রাচীনকালে মানুষ উলঙ্গ বসবাস করত। এরপর তারা বস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল। তারা বস্ত্রের চাহিদা মেটাত গাছের লতা-পাতা, ছাল-বাকল, পশুড় চামড়া দিয়ে। এরপর তারা আশ, সুতা আবিষ্কার করে এবং সেই সুতা দিয়ে যে কাপড় বোনা সম্ভব তা উপলব্ধি করতে শুরু করে। এভাবেই কাপড়ের ব্যবহার প্রথম শুরু হয়।


ঠিক কোথায়, কখন, কিভাবে পোশাকের ব্যবহার শুরু হয় সেটা কারো জানা নেই। প্রথমে মানুষ সুই-সুতা দিয়ে নিজের হাতে সেলাই করে নিজের পোশাক তৈরি করত। এরপরে তারা প্রয়োজনের খাতিরে আবিষ্কার করল সেলাই মেশিন। সেই থেকেই পোশাক শিল্পের উন্নতি হতে শুরু হলো।


১৭৫৫ সালে ইংল্যান্ডের চার্লস ফ্রেডরিক প্রথম যান্ত্রিক সেলাই মেশিন আবিষ্কার করেন। সেই সেলাই মেশিন দিয়ে মানুষের হাতে করা সেলাই এর মত সেলাই হত। ১৮৫১ সালে ইসাক মেরিট সিঙ্গার সেলাই মেশিন আবিষ্কার করেন।


বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের যাত্রা

বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে যতটা না পরিচিত তার থেকে অনেক বেশি পরিচিত গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিতে উন্নত বলে। প্রতিবছর আমাদের দেশের পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ পরিবার এই গার্মেন্টস শিল্পের উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে।


প্রথম গার্মেন্টস কোম্পানি স্থাপিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু হয় ষাটের দশকে। এরপর থেকে ধীরে ধীরে এই শিল্পের উন্নয়ন ঘটতে থাকে। বাংলাদেশে পোশাক শিল্প আর এম জি নামেও পরিচিত। বাংলাদেশে গার্মেন্টস কোম্পানিগুলোর যাত্রা যে সুবিন্যস্ত ছিল তা কিন্ত নয়।


রিয়াজ উদ্দীন ও বাংলাদেশের প্রথম গার্মেন্টস কোম্পানি

সুবিন্যস্ত কারখানায় বানিজ্যিকভাবে পোশাক উৎপাদন তখনকার সময়ের জন্য পুরোপুরি নতুন এবং চমকপ্রদ বিষয়। বাংলাদেশের প্রথম গার্মেন্টস কোম্পানি স্থাপিত হয় ১৯৬০ সালে। ‘রিয়াজ স্টোর’ নামে সেই কোম্পানি টি স্থাপিত হয় ঢাকার উর্দু রোডে।


এই গার্মেন্টস কোম্পানির মালিক ‘রিয়াজ উদ্দীন’ করাচি ভ্রমণকালে একটি গার্মেন্টস কোম্পানিকে দেশের বাইরে পোশাক রপ্তানি করতে দেখেন। সেখান থেকেই তার স্বপ্ন দেখা শুরু।


তিনি চিন্তা করেন যেভাবেই হোক দেশের বাইরে পোশাক রপ্তানি করতে হবে। তার স্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস এবং শ্রমই বাংলাদেশ থেকে প্রথম পোশাক রপ্তানির কারণ। ১৯৬৭ সালে ১০ হাজার পিস শার্ট প্রথম যুক্তরাজ্যে রপ্তানি করা এই গার্মেন্টস কোম্পানি।


এরপর ১৯৭৩ সালে তিনি “রিয়াজ স্টোর” নাম পরিবর্তন করে তার কোম্পানির নাম দেন “রিয়াজ গার্মেন্টস”


এক্সপোর্ট কোম্পানি দেশ গার্মেন্টস

এরপর একটি গার্মেন্টস স্থাপিত হয় যার নাম “দেশ গার্মেন্টস”। এটা ছিল একটি এক্সপোর্ট কোম্পানি। ৭০দশকের শেষে এ দেশে ৯টা রপ্তানি করে এমন কোম্পানি স্থাপিত যাদের মধ্যে বেশিরভাগই ইউরোপে রপ্তানি করত। এই কোম্পানিগুলো প্রতিবছর ১০ লাখ মার্কিন ডলারের ব্যবসা করত।


সেই সময়ের সুপ্রতিষ্ঠিত ৩টি গার্মেন্টস কোম্পানির নাম হলো: রিয়াজ গার্মেন্টস, প্যারিস গার্মেন্টস, জুয়েল গার্মেন্টস।


এছাড়া সেই সময়ে ‘বন্ড গার্মেন্টস’ -এর মরহুম আখতার মোহাম্মদ মূসা, ‘প্যারিস গার্মেন্টস’ -এর মোঃ হুমায়ুন, আজিম গ্রপের প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ ফজলুল আজিম, সানম্যান গ্রুপের মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান, স্টাইলক্রাফট লিমিটেডের উদ্যোক্তা এম. শামসুর রহমান, বিজিএমইএ’র প্রথম সভাপতি, অ্যারিস্টোক্র্যাট লিমিটেডের উদ্যোক্তা এ. এম. সুবিদ আলী প্রমুখ ব্যাক্তিবর্গ এগিয়ে আসেন এবং আমাদের দেশে আরো কয়েকটি গার্মেন্টস কারখানা তারা প্রতিষ্ঠা করেন।


বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গার্মেন্টস কোম্পানির ভূমিকা

গার্মেন্টস প্রস্তুতকারক ও গার্মেন্টস রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে ১৯৮১-৮২ সালে ০.১ বিলিয়ন টাকার রেডিমেইড গার্মেন্টস রপ্তানি করে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু করে। ওই সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গার্মেন্টস শিল্পের তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিলো না।


১৯৮২ সালে দেশে গার্মেন্টস ছিলো ৪৭টি। কিন্তু ১৯৮৫তে গিয়ে গার্মেন্টস কোম্পানির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৮৭টি। কম উৎপাদন খরচ ও স্বল্প শ্রমমূল্য ছিল গার্মেন্টস কোম্পানিগুলোর পোশাক। সেই কারণে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশ একটি আকর্ষণীয় বিনিয়োগের স্থান পায়।


তারপর গার্মেন্টস কোম্পানিগুলোর উন্নতি হতে থাকে। এভাবেই বাংলাদেশ বিশ্বে রপ্তানিতে একটি অন্যতম জায়গা গড়ে নেয়। ১৯৯৯ সালে এদেশে গার্মেন্টস সংখ্যা দাঁড়ায় ২৯০০টি। ১৯৮২ থেকে ১৯৯২ এই ১০ বছরে এই খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় ১৪৪৫ ইউএস ডলার।


বৈদেশিক রেমিটেন্সে গার্মেন্টস কোম্পানির ভূমিকা

১৯৮৩-৮৪ সালে এই খাত থেকে আয় হয় ০.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ০.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ওইসময়কার মোট জিডিপির ৩.৮৯ শতাংশ। সেই সময় রপ্তানি ১৯৯৮-৯৯ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৫.৫১ বিলিয়ন ডলার।


১৫ বছরের ব্যাবধানে দেশের অর্থনীতির বৈদেশিক রেমিটেন্স অর্ধেকের বেশি তৈরী পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে। এখন পর্যন্ত এই ধারা চলমান রয়েছে। তবে নিট বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ছিল এর মাত্র ৩০%। কারণ, তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল এবং আনুষঙ্গিক উপকরণ আমদানিতে ব্যয় হত আয়কৃত বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় ৭০%।


বাংলাদেশের মতো একটা দেশে এতো অল্প সময়ের মধ্যে পোশাক কারখানার এই উন্নতি আশ্চর্যজনক যা অনেক উন্নত দেশ কল্পনাতেও আনতে পারেনা। এর মাঝে ও নানা সময়ে নানা প্রতিকুলতা এসেছে, বিশেষ করে ১৯৭১ পূর্ববর্তী সময়ে পোশাক কারখানার আধিপত্য বিস্তার করে পাকিস্তানিরা, এতে অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতির স্বীকার হয় পূর্ব পাকিস্তান।


কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে পোশাক খাতের ভূমিকা

বাংলাদেশ যেহেতু একটি উন্নয়নশীল দেশ সেহেতু এই দেশ দেশের অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল অনেকটাই। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে তৈরী পোশাক খাতের ভূমিকা প্রতি বছর বৃদ্ধি পেতে থাকে প্রথম থেকেই।


তাই তো আমাদের দেশের অর্থনৈতিক চাহিদাকে আরও বেগবান করতে পোশাক শিল্পের কোন বিকল্প নেই, একথার থেকে বড় সত্য আর কি হতে পারে।


এছাড়া পুরো পৃথিবীতে পোশাক খাতে বাংলাদেশের সুনাম রয়েছে যা সম্ভব হয়েছে প্রথম থেকে এখন অব্দি গার্মেন্টস কোম্পানিগুলোর ক্রমাগত উন্নতির কারণে।


শেষকথা

গার্মেন্টস কোম্পানিগুলো প্রথম দিকে সুবিন্যস্ত না থাকলেও যত দিন যেতে থাকে তারা কোম্পানিগুলোর পরিবর্তন করতে থাকে, যার কারণে এখন কোম্পানিগুলো সুবিন্যস্তভাবে কাজ করতে পারছে। অতএব, আমাদের উচিত এই শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করে দেশের অর্থনীতিতে অগ্রণী ভুমিকা পালন করা।


আরও পড়ুনঃ দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধির কারণ ও প্রতিকার