রমজান নিয়ে ব্যক্তি অভিজ্ঞতা: শপথ রমজান এর

এই পাক (পবিত্র) রোজা (রমজান) মাসে এই শপথ বাক্য সে গভীর ভাবে মনে মনে উচ্চরণ করে সর্বদা। বিশেষ ভাবে সে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছে, পুরো একমাস সে নিয়মিত রোজা রাখতে পারবে না কিন্তু সে কলকাতার লেকটাউনের ইলা মাসীমা যিনি কাতর হয়ে বলেন- জাভেদ, আমায় সারিয়ে দাও, কতদিন আমি হাঁটা চলা করতে পারি না, কত দিন বাইরে বেরুতে পারি না! তাঁকে সে সারিয়ে তুলবে ইনশাআল্লাহ্।

রমজান নিয়ে ব্যক্তি অভিজ্ঞতা:  শপথ  রমজান এর
রমজান নিয়ে ব্যক্তি অভিজ্ঞতা: শপথ রমজান এর

“আজ অনেক দেরী হয়ে গেলো”, জাভেদ সকালের নাস্তা (জলখাবার) গিলছিলো- ব্রেড, ডিম আর কলা। সে চেঁচালো- আম্মু আমি এতো খেতে পারছিনা, ঠিক ১০ টার সময় পেশেন্ট বাড়ী পৌঁছতে হবে। মহাজবীন এসে এসে ছেলের পিঠে হাত রেখে বললেন- এতো তাড়া হুড়ো করিস না বাপ! গলায় লেগে যাবে।


জাভেদ একটা পিস ব্রেড, ডিম সেদ্ধটা ফেলে ছড়িয়ে, কলার আধখানা খেয়ে “বাই অম্মু” বলে ছুটে বেরিয়ে গেল। মহজবীন তার পার্স, মোবাইল, রুমাল আগেই ছেলের হাতে গুঁজে দিয়েছিলেন। পেশেন্টের কলকাতার লেক টাউনের বাড়ীতে পৌঁছতে ঘন্টা খানেক তো লাগবেই, জাভেদ কব্জি উলটে দেখলো, ন’টা বেজে গেছে।


দরজায় বেল বাজলো। তখন ইলা  চা দিয়ে পরোটা খাচ্ছিলেন খাবার টেবিলে বসে। ছেলে সুভাষ উঠে দরজা খুললো। জাভেদ ভিতরে এসে বললো- মাসিমা একটু দেরী হয়ে গেলো- বলে একটু অপ্রস্তুতের হাসি হাসলো। ইলা তাড়াতাড়ি বললেন- না, না তাতে কি, দেখোনা আমিও তো এখন জলখাবার খাচ্ছি। তুমি খেয়েছো তো? “হ্যা মাসিমা আমি খেয়েছি।”


ইলা উঠে হাত মুখ ধুয়ে ঘরে এলেন শোবার ঘর তাঁর। বড় বৌমা শোভা এসে বিছানার ওপর এক পাশে একটি চাদর পেতে দরজা বন্ধ করে চলে গেলো। ইলা ধীরে ধীরে বিছানার ওপর শুয়ে পড়লেন।


জাভেদ এতোদিনে এসে এসে সব কিছু চিনে গেছে। তেলের বাটিতে খানিকটা তেল ঢেলে, জানালার শিক থেকে টাঙানো ন্যাপকিনটা টেনে নিয়ে বিছানার এক পাশে বসলো,


“কেমন আছেন আজ মাসীমা?”


ইলা বললেন- কি বলবো বলো তো! কাল তো ঘাড়ের ব্যথায় মরে যাচ্ছিলাম, আজ দেখো না এই ডান কনুইয়ের নিচ থেকে পিঠ অবধি সমানে অসহ্য ব্যথা হয়ে যাচ্ছে।


জাভেদ বললো- দাঁড়ান, দেখছি আমি মাসীমা। সে ইলার কনুইয়ের নিচ থেকে পিঠ পর্যন্ত  জবজবে তেল লাগিয়ে আই এ এস সফট টিসু মুভিলাইজেশন নিয়ে রেডি হলো। নিজের শার্টের হাতাটা একটু গুটিয়ে নিলো- সে লম্বা হাতা শার্ট পরেছিলো।


আই এ এস টি এম দিয়ে কনুই থেকে পিঠ মালিশ করতে লাগলো। মাঝে মাঝে থেমে থেমে হাতের আঙুল দিয়ে পয়েন্ট নির্ধারিত করে সেখানে চাপ দিতে লাগলো। আবার ছেড়ে দিতে লাগলো।


এক এক সময় ইলা ‘উঃ! আঃ!’ করে চিৎকার করে উঠতে জাভেদ পরম মমতায় বলতে লাগলো- আচ্ছা, আচ্ছা মাসীমা, একটু সহ্য করুন, ব্যথা কমে যাবে এমনি করলে।


ইলা রায় চৌধুরী আজ ২০/২২ বছর হয়ে গেলো রিউম্য্যটয়েড আর্থারাইটিড এ ভুগছেন। সমস্ত শরীরে তাঁর অসহ্য ব্যথা। এপোলো হসপিটালে চিকিৎসা অধীনে তিনি।


কিন্তু বড় হাসপাতালের বড় ডাক্তারদের বড় ব্যাপার। ছ’ ছ’ মাস পরে তিনি এপয়েন্টমেন্ট পান। ইলা অজস্র ওষুধপত্র খান। ইতিমধ্যে তিনি হাইপারটেনশন ও শর্করা রোগে গ্রসিত। রাতে তাঁর ঘুম হয় না। বাইরে কোথাও কতদিন যে বেরুতে পারেননি, তা বলা দুষ্কর! এ দিকে দিনের বেলা ওষুধের ঘোরে ঘুমিয়ে পরেন যখন তখন!


ফিজিওথেরাপিস্ট ডা. জাউয়াদ ফাহমি, ডাক নাম জাভেদ কে তাই তিনি মালিশ থেরাপির জন্য এপয়েন্ট করেছেন।


সে আসে সপ্তাহে একদিন ছেড়ে একদিন। কতটা কি হয় বোঝা যায় না। খানিকটা আরাম, আবার যে তো সেই!


ডা. জাভেদ ফিজিওথেরাপির কোর্স পাশ করেছে তিন বছর হয়েছে। টুয়েলেভ ক্লাস করার সময় সে ভেবে নিয়ে ছিলো, চিরাচরিত পথে না গিয়ে সে অন্য কিছু করবে। অন্য ক্যারিয়ার নেবে।


ওয়েস্টবেঙ্গল হেলথ সায়েন্স ইনস্টিটিউট এর অধীনে দুর্গাপুর প্যারামেডিক্যাল কলেজে থেকে সে ফিজিওথেরাপিস্ট কোর্সটি পাশ করেছে। সময় লেগেছে চার বছর। ছ’মাস ছিলো ইন্টার্ণশীপ এ।


সে কোনও স্থায়ী হসপিটালে নয় নিযুক্ত। বিভিন্ন জায়গা, প্রতিস্থানে ও কিছু নির্দিষ্ট বাড়ী তে তার ডা. চিকিৎসায় যায়। তার রোজগার কম নয়। এক একটি সিটিং এ তার ফিস নেয় ৪০০০ টাকা করে এক এক ঘন্টায়।


ডা. জাউয়াদ ফহমি আরও তিন জায়গায় এটেন্ড করে যখন তার বাস স্থান বাগুইআটি পৌঁছলো তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল পাঁচটা বাজছে। মহাজমিন সাড়া পেয়ে এসে বললেন- এলি বাপ! শোন না মুখ হাত ধুয়ে চা খেয়ে একটু বাজারের দিকে যাবি?


“কেন আম্মু এখন দোকানে?”


হ্যাঁ, রে, রমজান মাস তো! “তাই নাকি অম্মু?” খুশীর গলায় বললো জাভেদ। “ওরে কাল থেকে তো রোজা, যদি চাঁদ দেখা যায়, ইনশাল্লাহ! দেখা তো যাবেই।”


“বেশ তো। হাসান কোথায় অম্মু? তাকে পাঠাও না।”


“না রে হাসান পারবে না দেখেশুনে জিনিষপত্র আনতে। কিছু জিনিষপত্র তো আনতে লাগবে বাপ!”


“কি কি?”


“শুকনো মেওয়া, বেশী করে খেজুর, বিরিয়ানী চাল, পনীরের কয়েকটা প্যাকেট নারকেল, আমি ফর্দ বানিয়ে রেখেছি।”


অম্মু আমি কাল ও আর একদিন শেষের দিকে ‘রোজা’ রাখবো। কাজের মাঝখানে হবে না বোধহয়।


এই সময় ছোট বোন রুবিনা চা ও নাস্তা নিয়ে এলো জাভেদের জন্য। চোখের একটা ইশারা করে বলে- ভাইজান রোকেয়া এসেছে দুলাভাইয়ের সাথে। তোমার কথা জিজ্ঞাসা করছিল।


বিরক্ত হয়ে জাভেদ বলে- কেন, আমার সঙ্গে কি দরকার তার? যা চুকে বুকে গেছে, আমি তা খুঁড়ে বের করতে চাই না।


জাভেদের বয়স এখন ২৭। স্কুলের ওপরের ক্লাসে রোকেয়ার সাথে তার একটু মন দেওয়া নেওয়া হয়েছিল বৈ কি! উচ্চ-মাধ্যমিকের পর সে দুর্গাপুর চলে যাওয়ায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এখন রোকেয়া বিয়ে শাদি করে মনের আনন্দে ঘর কন্যায় ব্যস্ত।


“অব্বুজান কোথায় অম্মু?” এমন সময় বাইরে থেকে কেউ বোধহয় পরিচিত আওয়াজ দিলেন- আহমেদ মিয়াঁ আছেন না কি?


জাভেদের বাবা নিশামত আহমেদ পাঁচ মাইল দুরে বিড়ি কারখানায় কাজ করে যে তিনি তিন ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছেন, এটা তাঁর কৃতিত্ব। ছোট ছেলে ফার্মাসিস্ট এর কাজ শিখছে আর রুবিনা ক্লাস ইলেভেন এ পড়ছে।


একটু পরে ফর্দ এনে দিলেন জাভেদের হাতে মহাজবীন। জাভেদ বেরিয়ে গেলো জিনিস পত্র আনতে। জাভেদ সংসারের ঘরোয়া কথা কিছু জানে না। তার মা (অম্মু) মহাজবীন আরা একজন পাক্কা ঘরণী, গৃহিনী।


‘রমজান’ উপলক্ষে সবার জন্য নতুন জামা কাপড় কিনেছেন তিনি। ঈদের চাঁদ দেখা যাবেই আগামীকাল - এই বিশ্বাস নিয়ে তিনি কয়েক জন কে দাওয়াত (নিমন্ত্রণ) দিয়েছেন- একসঙ্গে ‘ইফতার’ এর খাওয়া দাওয়া করবেন বলে!


তিনি তো নিত্য পাঁচ ওয়াক্ত নমাজ পড়েন। এই একটা মাস ‘রোজা: কালীন পবিত্র মাসে আরও মনযোগ সহকারে নামাজ পড়বেন তিনি। “রসুল আল্লাহর” ফরমান জানেন তিনি এক সাচ্চা মুসলমান হিসেবে। রোজা  গুনাহ আর জাহান্নাম এর আগুন থেকে বাঁচবার এক ঢাল “তিনি জানেন ভালো করে।”


“পবিত্র কুরআন শরীফ” তিনি এই পবিত্র মাসে আরও মন প্রাণ দিয়ে পাঠ করবেন।


রাতে সবাই আনন্দে খুশীর হাসিতে হুল্লোড় করে উঠলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখস গেলো পরম প্রতিক্ষিত চাঁদ। খুশীর চাঁদ।


আহমেদ মিঁয়া নিজের জায়নামাজটি ছাদের এক কোণে  বিছিয়ে ‘এশা’র নামাজ পড়লেন, মসজিদ থেকে তার আগে আজান এর সুর ভেসে এসেছে। কাল থেকে “রোজা” ।


রাত তিনটে থেকে সবাই উঠে পড়ে ‘গোসল’ সেরে নিয়েছে এক এক করে। মসজিদ থেকে এলো আজান এর সুর। সবাই ‘ওজু’ করে নিয়ে ‘ফজর’ এর নামাজ পড়ে নিচ্ছে। বানানো হয়েছে- পরোটা, ডাল, সব্জি, আর আছে মিস্টি দই।


খাওয়া দাওয়া সেরে নিলো সবাই, ততোক্ষণে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে বাইরে। জাভেদ আজকের প্রথম রোজা আর পঞ্চদশ রোজা পালন করবে মনে করেছে। তাকে কলকাতায় যেতে হয় প্রচুর পেশেন্ট তার।


সঙ্গে বিভিন্ন ইন্সট্রুমেন্ট নিতে হয়, ব্যথার রকম বুঝে কাউকে দিতে হয়, “ই উ স টি (আল্ট্রাসাউন্ড থেরাপি)”, কাউকে দিতে হয় “টেনস (ট্রান্সকিউটিভ ইলেকট্রিক নার্ভ সিটুমুলেশন)”, আবার কারুর জন্য “এমন্স (মাসল সিটমুলেটার)” ।


ব্যাচেলার অব ফিজিওথেরাপির কোর্স শেষে তথা ইন্টার্ণশীপ সেশন শেষ হবার পর সে যে শপথ বাক্য নিয়েছিলো- সেই উক্তিটুকু সব সময় তার মনে জাগড়িত হয়ে থাকে- “আমি আমার এই পবিত্র পেশায় সৎ থাকবো, যারা আমার ওপর ভরসা করে নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ করবে বিশ্বাস করে তাদের সেই বিশ্বাসের যথাসাধ্য মর্যাদা রাখবার চেস্টা প্রাণ পণে করবো।”


এই পাক (পবিত্র) রোজা (রমজান) মাসে এই শপথ বাক্য সে গভীর ভাবে মনে মনে উচ্চরণ করে সর্বদা। বিশেষ ভাবে সে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছে, পুরো একমাস সে নিয়নিত রোজা রাখতে পারবে না কিন্তু সে কলকাতার লেকটাউনের ইলা মাসীমা যিনি কাতর হয়ে বলেন- জাভেদ, আমায় সারিয়ে দাও, কতদিন আমি হাঁটা চলা করতে পারি না, কত দিন বাইরে বেরুতে পারি না! তাঁকে সে সারিয়ে তুলবে ইনশাআল্লাহ্।


জাভেদ অনুভব করেছে- “রোজা” শুধু মাত্র একটি ইবাদত নয়, এটি ইসলাম ধর্মে খুব নিষ্ঠা ও আবেগ এর প্রতীক! সে পুরো একমাস হয়তো রোজা (উপবাস) রাখতে পারবে না কিন্তু তার মানব ধর্ম (দায়িত্ব) অতি অবশ্য পালন যে করে যেতে হবে!


আরও পড়ুনঃ আমার সাহিত্য জীবন ও বাংলাদেশ ভ্রমণ