রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের সার্বিক অবস্থার সেমিওটিক বিশ্লেষণ

পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের কোনো ঘটনার কিছু উপাদান সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারলে সেটির অভ্যন্তরের জটিল ও সূক্ষ্ম বিষয়গুলো সম্পর্কে আন্দাজ করা যায়। তবে দূর থেকে অনেক সময় ঘটনার সব উপাদানকে বিশ্লেষণের আধেয় হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। ফলে শতভাগ সঠিক কিছু আন্দাজ করতে না পারার সমীকরণ হাতে রেখেই রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের সার্বিক অবস্থার সেমিওটিক বিশ্লেষণ নিম্নে হাজির করা হলো।

রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের সার্বিক অবস্থার সেমিওটিক বিশ্লেষণ
রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের সার্বিক অবস্থার সেমিওটিক বিশ্লেষণ

করোনা ভাইরাসের ভয়ংকর অবস্থা থেকে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পৃথিবীর মানুষ জীবনযাপন শুরু করেছে। তবে এরই মধ্যে নতুন সংকটের আবির্ভাব দেখা দিয়েছে। বর্তমানের মতো সভ্য সময়ে তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের ডামাডোল বাজছে।


রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের সার্বিক অবস্থার সেমিওটিক বিশ্লেষণ

ইউরোপের মধ্যে সভ্য অঞ্চলের দুটি দেশের মানুষের ঘুম ভাঙ্গছে কামান, গোলা ও মিসাইলের শব্দে। বর্তমান সময়ে এসে এমন যুদ্ধ কিংবা আগ্রাসন কোনটিই কাম্য নয়। কারণ দুই প্রেসিডেন্টের ছোট ছোট সিদ্ধান্তে হাজার হাজার মানুষের মানবতা ও মৌলিক অধিকার বিপন্ন হচ্ছে।


বিশ্বব্যাপি মুদ্রাস্ফিতি, অর্থনৈতিক মন্দা, খাবার ও জ্বালানী তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। সার্বিকভাবে নতুন একটি বড় যুদ্ধের সম্ভবনা প্রতিনিয়ত প্রবল হচ্ছে।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘কোনোভাবে যুদ্ধ যদি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে তাহলে সকল ধরনের সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে। কোনো পক্ষ যদি তার সর্বোচ্চ পারমানবিক ক্ষমতার প্রয়োগ করে তাহলে পৃথিবী নামক গ্রহের অনেকটাই ধ্বংস হয়ে যাবে।’


পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের কোনো ঘটনার কিছু উপাদান সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারলে সেটির অভ্যন্তরের জটিল ও সূক্ষ্ম বিষয়গুলো সম্পর্কে আন্দাজ করা যায়। তবে দূর থেকে অনেক সময় ঘটনার সব উপাদানকে বিশ্লেষণের আধেয় হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব হয় না।


ফলে শতভাগ সঠিক কিছু আন্দাজ করতে না পারার সমীকরণ হাতে রেখেই রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের সার্বিক অবস্থার সেমিওটিক বিশ্লেষণ নিম্নে হাজির করা হলো -


ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মূলে হলো দুই রাষ্ট্র প্রধানের অনিরাপত্তার শঙ্কা

১৯৯১ সালে বৃহত্তম সোভিয়েত ইউনিয়নের অবসানের পর ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলোকে পশ্চিমা ও অ্যামেরিকার কাছ থেকে দূরে থাকার কথা বলা হয়েছিল। একই সাথে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গনের শান্তিপূর্ণ চুক্তির কথা সাবাইকে স্মরণ রাখার আহ্বান জানানো হয়।


কিন্তু সেই সব অতীতের কথা ভুলে যায় অনেক দেশ। যার মধ্যে অন্যতম হলো ইউক্রেন। তারা বিভিন্নভাবে রাশিয়া বলয় থেকে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। গোপনে রাশিয়া বিরোধী সামরিক জোট ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে।


এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইউক্রেনসহ রুশ প্রতিবেশী বাল্টিক দেশগুলোয় সৈন্য ও সমরাস্ত্র পাঠাচ্ছিল। তখন একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে সেটি হলো রাশিয়ার আক্রমণ। কারণ রাশিয়া নিজেদের নিরাপত্তার জন্য সব কিছু করতে পারে।


বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র যতই নিন্দা প্রস্তাবসহ বিশ্ব ঐক্যের আহ্বান জানাচ্ছে সেটি আসলে মেকি। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের পাশ্ববর্তী মেক্সিকোকে যদি কোনো দেশ নিজেদের বলয়ে নিয়ে এসে ওয়াশিংটন-নিউইয়র্কের দিকে মিসাইল তাক কলে তাহলে এক সেকেন্ড লাগবে না মেক্সিকোতে হামলার।


ফলে ইউক্রেনে হামলার জন্য পশ্চিমা বিশ্বসহ ইউক্রেনের দোষ এড়ানোর জায়গা নেই। কারণ রাশিয়ার কাছ থেকে নিজেদের বাঁচাতে যেমন জেলেনস্কি অন্যদের থেকে সামরিক সহযোগীতা নিয়ে প্রস্তুত থাকতে শুরু করেছে তেমনি ন্যাটোসহ অন্যান্য সব মিত্রদের থেকে নিরাপদে থাকার জন্য রাশিয়া আগ্রাসন চালিয়েছে।


একই সাথে পুতিন ঘোষণা করেছেন, ‘এই যুদ্ধে অন্য কেউ নাক গলালে মস্কো এক বিন্দু ছাড় দিবে না। এছাড়া তার বিরুদ্ধে এমন কিছু করা হবে যা আগে কখনো কেউ ভাবেনি।’


বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও পুতিনের কৌশল

চলতি বছরের গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রসনের পর থেকে পশ্চিমারা নানা নিষেধাজ্ঞা পুতিনকে কোণঠাসা করে রাখতে চাইছে। রাশিয়া ও পুতিনসহ তার সহযোগীদের সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। জনপ্রিয় সুইফট সিস্টেম থেকে রাশিয়াকে ব্যান করা হয়েছে।


রাশিয়ার বিমান, জাহাজ ও বিভিন্ন যানবাহনের উপরে চলাচলে আকাশ ও সমুদ্রসীমায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে মিত্ররা। তবে পুতিন চীনা যুদ্ধবিশারদ সান ঝুয়ের দ্য আর্ট অব ওয়ার এর সব রণকৌশল মেনে এগিয়ে চলছেন। সেই কৌশলে তিনি সোভিয়েতের হারানো সব গৌরব ফিরিয়ে নিয়ে আসতে মরিয়া পুতিন।


জেলেনস্কি ও বন্ধু মিত্রদের বরফ গলার কারণ

যুদ্ধের বায়ুপ্রবাহ শুরু হওয়ার আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বলে আসছিল যে, ইউক্রেনের স্বাধীনতায় কেউ হস্তক্ষেপ করলে তার খবর আছে। আবার ভিন্নভাবে বলছিল যে, যেকোনো সময় ইউক্রেনের ভূখন্ডে রাশিয়া আঘাত হানবে।


এই বলার কিছুদিন পর আসলেই খবর সত্য হলো কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন মিত্ররা ইউক্রেনের জন্য তাদের অবস্থা দৃঢ়ভাবে দেখালেন না। এসময় খুব জরুরীভাবে অনেক দেশকে জেলেনস্কি সাহায্যের আহ্বান করেন কিন্তু কেউ সামরিকভাবে এগিয়ে আসেনি।


তারা শুধু মৌলিক অধিকার ও খাদ্যদ্রব সাহায্য পাঠায়। কারণ হিসেবে দেখা যায়, রাশিয়ার তেল না হলে তো গোটা ইউরোপ মুখ থুবড়ে পড়বে।


এছাড়া ইউরোপের ৩০ শতাংশ গ্যাস রাশিয়া থেকে যায় ফলে সেদিক দিয়েও কিছু বলা যায় না। এমন অনেক কারণেই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বন্ধুত্বের মধ্যে বরফ গলা শুরু হয়।


এই যুদ্ধে বিশ্ববাসীর লাভ ও ক্ষতি

বিশ্ব অর্থনীতিতে পুঁজিবাদী কাঠামোর অবস্থান অনেক বেশি শক্তিশালী। ফলে এই যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। যেটা মূলত মোটাদাগে পুঁজিপতিদের লাভ। অন্যদিকে ক্ষতি হচ্ছে সবার।


কারণ মুদ্রাস্ফিতি বৃদ্ধির কারণে বিশ্ববাজারে বিভিন্ন জিনিসপত্রের দাম অনেক বৃদ্ধি পাবে। এরই মধ্যে বিশ্ব জ্বালানী তেল ও গ্যাসের দাম বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া ইস্পাতের দাম আরো বেশি বৃদ্ধির সম্ভবনা প্রবল হয়ে যাচ্ছে।


খাদ্যদ্রব ভুট্টার দাম বিগত ২০ বছরের চেয়ে বৃদ্ধি হয়েছে। কারণ এই সব পণ্যগুলো যদ্ধে অংশগ্রহণকারী দেশে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয়।


যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি

স্বাধীন ইউক্রেন ভূখন্ডে রাশিয়ার আগ্রাসনের দ্বাদশ দিন পেরিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব গুতেরেস সব ধরনের হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হামলার নিন্দা জানিয়েছেন।


প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ার পরও এখনো কোনো পক্ষ থেকে যুদ্ধ বন্ধের আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে ইউক্রেনের দুটি রাজ্য দুনেৎস্ক ও লুহানৎস্ককে স্বাধীন ঘোষণা করেছে রাশিয়া। বরং যুদ্ধে রাশিয়ার ক্ষতি বাড়ানো জন্য দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে ইউক্রেন।


কারণ কয়দিন আগেই কয়েকটি দেশ থেকে সমরাস্ত্র ও গোলা-বারুদ পেয়েছে ইউক্রেন। এমন সহযোগীতা অব্যাহত থাকলে যুদ্ধ আরো বেশি দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে মনে করেন বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা।


এছাড়া ন্যাটোর কোনো দেশ হামলায় আক্রান্ত হলে যুদ্ধে আরো ৩০টি দেশ জড়িয়ে যাবে ফলে যেকোনো সময় বড় কিছু ঘটার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়ার মত নয় বলে মত দিয়েছেন তাঁরা।


আরও পড়ুনঃ দ্রবমূল্যের দাম বৃদ্ধির কারণ ও প্রতিকার