শতবর্ষে শরৎচন্দ্র’র দেবদাস, খেয়াল নেই বাঙালীর

আশ্চর্য এই যে আমরা সব ভুলে যাই। শতবর্ষ আসে, নীরবে চলে যায়। আমাদের মনে ছিল কি দু’হাজার সতেরো সালে বাংলার সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্ট্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস শতবর্ষে উপনীত। অবশ্য সাথে আরও দু’টি বইও আছে ‘শ্রীকান্ত’ (প্রথম পর্ব) ও ‘চরিত্রহীন’।

শতবর্ষে শরৎচন্দ্র’র দেবদাস, খেয়াল নেই বাঙালীর
শতবর্ষে শরৎচন্দ্রর দেবদাস, খেয়াল নেই বাঙালীর

আশ্চর্য এই যে আমরা সব ভুলে যাই। শতবর্ষ আসে, নীরবে চলে যায়। আমাদের মনে ছিল কি দু’হাজার সতেরো সালে বাংলার সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্ট্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস শতবর্ষে উপনীত। অবশ্য সাথে আরও দু’টি বইও আছে ‘শ্রীকান্ত’ (প্রথম পর্ব) ও ‘চরিত্রহীন’।


রেঙ্গুন প্রবাস কালে ‘দেবদাস’ নামে যে কাহিনী টি লিখেছিলেন সেটি তাঁর বন্ধু প্রমথ নাথ ভট্টাচার্য জোর করে এবং লেখকের আপত্তি না শুনে ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায় গোটা কতক সংখ্যায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করেন।


লেখকের কাছে যা ছিল অপকৃস্ট এবং অবহেলিত, সেই কাহিনীই আজকের ভারতের সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রর প্রধানতম পতাকাবাহী সৃষ্টি। ‘দেবদাস’ এর অমর স্রষ্টা রুপে দেশের মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছেন তিনি।


তাঁর জনপ্রিয়তার পরিমাপ করা দুঃসাধ্য। ভারতের প্রায় সব ভাষায় তাঁর রচনা অনূদিত ও পঠিত। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের বুদ্ধিজীবী মহল জনতার ভালবাসা কোনও স্রস্টার শ্রেষ্ঠত্ব কিংবা সার্থকতার নিরিখ বলে করেন না।


ইন্টেলেকচুয়াল ক্রিটিকদের সন্মান জানিয়ে আজ বলার সময় এসেছে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার সত্যচিত্র যদি শরৎচন্দ্রর রচনায় থাকে তা হলে কোনও স্বীকৃতি বা শিরোপার দরকার নেই। আরও একবার তাঁর রচনাসমুহের দ্বার খুলে প্রবেশ করাটাই জরুরী।


এতো বছর পর এখনো ‘দেবদাস’ পড়ে লোকে চোখের জল ফেলে। ছোট্ট একখানি উপন্যাস। কিন্তু এখনো তার আবেদন সর্বভারতীয়। উপন্যাসটিতে মোটামুটি দেবদাস, পার্বতী, ভুবন বাবু, চুনিলাল ও চন্দ্রমুখী। বাকি আরও চরিত্র আছে, তারা গল্পের সুতো বুনে আগে এগিয়ে নিয়ে গেছে।


ভুবন বাবু বছর চল্লিশের যুবা। নিজেকে সে পিতৃস্থানীয়র মতো ভাবে স্ত্রী পার্বতীর ব্যাপারে। আর পার্বতীও নিজের পনেরো বছর ভুলে মহেন কে বাবা- বাছা ও যশোদাকে বড় মেয়ে বলে সম্ভোধন করে যৌবনেই সাধিকার মতো হয়ে গেলো।


হিন্দি বা বাংলা বা অন্য ভাষার চলচ্চিত্রে চুনিলাল কে খল চরিত্র করে তুলেছে, তা সে ছিল না। সে লম্পট বা মাতাল হলেও দেবদাস কে ঐ পথে নিয়ে যেতে চায়নি। আর চন্দ্রমুখী! সে কি বারবনিতা, বাইজি! গল্পে এমন কোন লক্ষণ নেই।


শরৎচন্দ্র মেয়েদের দেবী বানাতে বড় ভালবাসেন। তা অতি তাঁর বাস্তব যুক্তি অতিক্রম করতে পিছ পা হন না। সুতরাং দেবদাস এর ক্ষণিক দর্শণে প্রেমে পাগলিনী হয়ে রাতা রাতি চন্দ্রমুখী শুদ্ধ ও পবিত্র হয়ে উঠলো। শরৎচন্দ্র শরীরি প্রেমে তেমন আগ্রহী নন। তাঁর বেশীর ভাগ প্রেম প্লেটোনিক। দেবদাস এ তিনি বড় বেশী দেহাতীত।


যে কোনও অভিজ্ঞ পাঠক জানেন ‘দেবদাস’ প্যাচপ্যেচে, রোমান্টিক অযৌক্তিক ও অবিশ্বাস্য। রহস্যটা সেখানেই। তাই যদি হবে তা হলে গত একশো বছর ধরে এই অপরিণত, অপরিপক্ক কাহনী টি এখনো পাঠক হৃদয়ে আসীন রয়েছে কি করে? এর ম্যাজিকটা কোথায়? কেন এখনো দেবদাস পড়ে লোকে চোখের জল ফেলে?


এই প্রশ্নের উত্তর ও ঐ ‘দেবদাস’ এ আছে। কী অসামান্য এর গল্পবুননের শিল্প! সহজ ভাষায় রচিত এক একটি পরিস্থিতি ও ঘটনা পাঠকের মনে দো ধার তলোয়ারের মতো পাঠকের মনে প্রবেশ করে। বার বার পড়েও একই অনুভুতি হবে।


সেই জন্য একশো বছরেও দেবদাস কে মারা গেল না। তার গরুর গাড়ী পারোর বাড়ী অবধি পৌঁছতে পারেনি, পারোর সঙ্গে তার মিলনও হয় নি, কিন্তু ওই প্রেম যাত্রা ফুরিয়েও যায়নি।


শতবর্ষে ‘দেবদাস’ -এর বিশ্বরেকর্ড। ছোট্ট এক উপন্যাস কিন্তু এখনো তার আবেদন সর্বভারতীয়। সেই প্রথম রচনা প্রকাশের পর থেকে আসমুদ্রহিমালয়ের কোটি কোটি পাঠক হৃদয় স্পর্শ করে চলেছেন বিশ্ববিজয়ী আলেকজান্ডার।


এক সময় তিনি শিশুসুলভ আনন্দে এক কান্ড করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টরেট দিতে নারাজ, তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন তাঁকে সমমানিত করতে চাইলো তখন শরৎ কোথায় কি ভাবে কনভোকেশনের গাউন কি ভাবে তৈরী করা যায় তা খোঁজ খবর করতে লাগলেন।


আসমুদ্রহিমালয় হেলায় জয় করে ইংরেজিতে অনুবাদ করার কথাও ভেবেছিলেন। একবার ইউরোপ ভ্রমণের কথাও ভেবেছিলেন, শোনা যায়। দুর্নামে অভ্যস্তরা রটিয়ে দিলেন নোবেল প্রাইজের কথা জেগেছে গেঁয়ো যোগীর মনে।


লোকে যাই বলুক, ভক্তজনের হৃদয়েশ্বর হয়ে তাঁর যেখানে স্থান, সেখানে একশো একটা নোবেল প্রাইজও শরৎচন্দ্রের পক্ষে যথেষ্ট নয়। যারা বলে বেড়ালেন তাঁর দেবদাস বেশী দিন ধোপে টিকবে না, তাঁদের কাছে নিবেদন, ঠিক একশো পাঁচ বছর আগে ১৯১৭ সালে দেবদাস গ্রন্থাকারে প্রকাশ হয়ে বেরিয়েছিল।


দেবদাস এর চলচ্চিত্র নির্মানের কথায় আসা যাক –

নির্বাক যুগে দেবদাস হয়েছিলেন ফণী শর্মা ও পার্বতী তারকবালা। শরতের পরবর্তী ইতিহাস ওয়র্ল্ড রেকর্ড। বই পাগলরা স্বীকার করেন দেবদাস এর মধ্যে এমন কিছু মৃতসঞ্জীবনী সুধা আছে যা সিলভার স্ক্রীনে কখনো পুরনো হয় না। এই বিজয় অভিযানে শুরুতেই প্রমথেশ বড়ুয়া, যিনি বাংলা, হিন্দি ও অসমীয়া তিন ভাষাতে, তিন বছরে তিন খানা দেবদাস বানিয়ে সারা ভারত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন।


দেবদাস ভারতের কোন ভাষাতে না হয়েছে! সেই দিন অনাগত নয় যখন শুধু দেবদাস কে নিয়েই আলাদা একটা চলচ্চিত্রোসব হবে। লক্ষ লক্ষ মানুষ বিচার করতে বসবে প্রমথেশ বড়ুয়া, সায়গল, দিলীপকুমার, শাহরুখের মধ্যে কোন দেবদাস আর পার্বতীর ভুমিকায় যমুনা বড়ুয়া, সুচিত্রা সেন, ঐশ্বর্য রাই কে শ্রেষ্ঠ!


আর চন্দ্রমুখী? সে আর এক মহাভারত। এবং দেবদাস তো কখনো পুরণো হবে না। প্রথম একশো বছরে যদি কুড়ি বার ছবি হয়ে থাকে পরবর্তী দশকে আরও কুড়িবার ছবি হবে! আমাদের আফসোস যে, এই প্রতিযোগিতায় উত্তম কুমার কে পাওয়া গেল না কেন!


মানুষের হৃদয় জয় লাভ করার অবিশ্বাস্য জাদু দিয়ে সযত্নে করে গেছেন শরৎচন্দ্র। কিন্তু প্রখ্যাত সুকুমার সেন তাঁর “বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস” -এর পাতায় শরৎচন্দ্রের প্রতি প্রবল নির্দয়। তাঁর কথায়- রং অত্যন্ত চড়িয়া গিয়া দেবদাস এর করুণ পরিণতি পাঠকের অশ্রু আকর্ষণ করিতে সমর্থ হইলেও শিল্পের হানি করিয়াছে।


সুকুমার সেন তাঁর ইতিহাসে শরৎচন্দ্রের জন্য আটাশ পাতা ও দেবদাস এর জন্য আড়াই পাতা বরাদ্দ করেছেন। আর একটা ব্যাপার লক্ষ করার, মৃতপ্রায় দেবদাস কে দেখতে পার্বতীর ছুট লাগানো, দেউড়ি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এই মেলোড্রামা উপন্যাসে শরৎ রচনা করেন নি।


আমাদের সাহিত্যে শরৎ বাবুর মতে, সতীত্বর ধারণা চিরদিন এক নয়। একনিস্থ প্রেম ও সতীত্ব যে ঠিক একই বস্তু নয়, এ কথা সাহিত্যের মধ্যেও যদি স্থান না পায় তাহলে এ সত্য বেচে থাকবে কি করে!


রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৬ সালে (২৫ আশ্বিন ১৩৪৩) শরৎচন্দ্রের জন্মদিনে বলেছিলেন- অন্য লেখকেরা অনেকে প্রশংসা পেয়েছেন কিন্তু সার্বজনীন হৃদয়ে এমন স্থান পাননি। এ বিষ্ময়ের চমক নয়, এ প্রীতি। অনায়েসে যে প্রচুর সফলতা তিনি পেয়েছেন তাতে তিনি আমদের ঈর্ষাভাজন!


দেবদাস আজও চমৎকার। দেবদাস আসলে একটা বিশ্বাসের নাম, যা তাকে গত একশো বছর বাঁচিয়ে রেখেছে। শরৎচন্দ্র আসলে এক জাদুকর। কাহিনী - কথনের জাদুকর।


জাদুকর যেমন ঘুরেফিরে মাথার টুপি খুলে কখনো পায়রা, কখনো খরগোশ, কখনো রঙিন রিবন, কখনো সোনালি রুমাল তুলে আনেন, শরৎচন্দ্র তেমন সুখ দুখ হাসি বেদনাকে সাধারণ মানুষের আঁত থেকে টেনে বের করে এনেছেন।


তাঁর সেরা জাদুকরের খেলা ‘দেবদাস’। গত একশো বছরে মানুষ একই ভাবে এই ম্য্যাজিকে মজে আছে। দেবদাস এর জনপ্রিয়তা যে শুধু ট্রাজিক নির্বাচনে, তা নয় তিনি বিষয় কে এমন কথন রীতির যে ভাষা নির্মাণ করেছিলেন তা অসাধারণ।


উপন্যাসের একটি গুরুত্বপুর্ন অংশ এই রকম- ‘আমি এসেছি পারো’। পার্বতী কিছুক্ষণ পর কহিল ‘কেন?’, ‘তুমি আসতে লিখেছিলে, মনে নেই?’, ‘না’।


‘সে কি পারো! সে রাত্রের কথা মনে পড়ে না!’


‘তা পড়ে, কিন্তু সে কথায় আর কাজ কি?’


ভাবী পরিচালকের জন্য এই ভাবে একটি সিনেম্যাটিক ডায়লগ তৈরী করেছিলেন তিনি। এই উপমহাদেশে সাকসেসফুল লেখক হওয়ার টিপটা টপ সিক্রেট। মেয়েরা যা পছন্দ করে, পুরুষরাও শেষ পর্যন্ত তাই মনে প্রাণে গ্রহণ করে থাকে আর সেটা বুঝেছিলেন বলেই শরৎচন্দ্র আজও অপরাজেয়।


আরও পড়ুনঃ স্মরণে সত্যজিৎ: চেনা মুখ কিন্তু অচেনা আগন্তুক