শেন কেইথ ওয়ার্ন: বাইশগজের একজন ঘুর্ণি জাদুকরের প্রস্থান

ক্রিকেট বিশ্বের বড় বড় ব্যাটসম্যাকে যিনি হাতের তালুর ভাঁজে নাচিয়েছেন। ২২ গজের ক্রিজে অসংখ্য ব্যাটিংকে প্রথম বলে ফিরিয়েছেন। ক্রিকেটের সকল ব্যাটিং গ্রামার ভুলিয়ে নতুন করে কোচদের ভাবনার কথা বার বার জানান দিয়েছেন। তিনি আর নেই। তিনি হলেন অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি শেন কেইথ ওয়ার্ন।

শেন কেইথ ওয়ার্ন: বাইশগজের একজন ঘুর্ণি জাদুকরের প্রস্থান
শেন কেইথ ওয়ার্ন : বাইশগজের একজন ঘুর্ণি জাদুকরের প্রস্থান

ক্রিকেট বিশ্বের বড় বড় ব্যাটসম্যাকে যিনি হাতের তালুর ভাঁজে নাচিয়েছেন। ২২ গজের ক্রিজে অসংখ্য ব্যাটিংকে প্রথম বলে ফিরিয়েছেন। ক্রিকেটের সকল ব্যাটিং গ্রামার ভুলিয়ে নতুন করে কোচদের ভাবনার কথা বার বার জানান দিয়েছেন। তিনি আর নেই।


শেন কেইথ ওয়ার্নের ব্যক্তিগত জীবন

তিনি ছিলেন বেপরোয়া স্বভাবের এক ভয়ংকর মানুষ। যিনি ক্রিকেট পিচে ও জীবনের কোনো জায়গায় নিজেকে অপূর্ণ রাখেন নি। বিষ্ময়কর বিষয় ছিল তার চোখের রঙ। যার মধ্যে একটি চোখ নীল ও আরেকটি সবুজ রঙের। ১৯৫ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সিমোন ক্যালাহানের সাথে বিবাহের সম্পর্কে আবদ্ধ ছিলেন।


এ সময় তাদের তিনটি সন্তান হয়। এরই মধ্যে বিবাহিত অবস্থায় ২০০০ সালে একজন ব্রিটিশ নার্সকে কামোত্তেজক টেক্সট বার্তা পাঠানোর জেরে অস্ট্রেলিয়া দলেল সহ-অধিনায়কত্ব হারান। তবে সিমোনের সাথে বিচ্ছেদের পর ইংরেজ অভিনেত্রী এলিজাবেথ হার্লির সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যান।


পরবর্তীতে ২০১১ সালের শেষের দিকে হার্লি এবং ওয়ার্নের বাগদান হয় বলে জানা যায়। এছাড়া অবসর গ্রহণের পর থেকে নিজের নামে প্রতিষ্ঠিত ‘শেন ওয়ার্ন ফাউন্ডেশনের’ কাজ করেছেন নিয়মিত।


অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি শেন কেইথ ওয়ার্ন

তিনি হলেন অস্ট্রেলিয়ান কিংবদন্তি শেন কেইথ ওয়ার্ন। বর্তমানে শারীরিক বিচারে লেগ স্পিনের ঘুর্নিও জাদুকর এখন আর আমাদের মাঝে নেই। তার এমন হঠাৎ প্রস্থান অনেক ক্রিকেটার, শুভাকাঙ্খী ও ভক্তরা মেনে নিতে পারছেন না।


কারণ কয়েক দিন আগেই তিনি ইংল্যান্ডের কোচ হতে চেয়েছিলেন। এছাড়া তার ডকুমেন্টারি সিরিজ বের হলো মাত্র।


শেন কেইথ ওয়ার্নের হঠাৎ প্রস্থান

গত ৪ মার্চ থাইল্যান্ডের একটি হোটেল কক্ষ থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। তবে মৃত্যর আগে তিনি কি করছিলেন সেটি নিয়ে পুরো দুনিয়া জুড়ে চলছিল আলোচনা। কোটি ভক্তের মুখে একই প্রশ্ন আসতে প্রিয় তারকা কিভাবে মাত্র ৫২ বছর বয়সে চলে গেলেন।


দেশটির কোহ সামুইয়ের একটি বিলাসবহুল ভিলায় ছুটি কাটাতে গিয়ে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান সর্বকালের সেরা এই লেগ স্পিনার। তবে তার মৃত্যর কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। পুলিশ এ বিষয়ে তদন্ত করছে। তদন্তকারী একটি বলছে, ‘ক্রিকেট তারকার মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল।’


ঘুর্নির জাদুকরের দেহের ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ অস্ট্রেলিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সরকার এই মহাতারকার শেষকৃত্য মেলবর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে করার ঘোষণা দিয়েছে।


ক্রিকেটের কিংবদন্তি; বল অব দ্য সেঞ্চুরি

তবে তিনি ক্রিকেটের কিংবদন্তি বরাবরই বৈচিত্রময় ছিলেন। তাঁর মতিগতি ধরতে পারা বড্ড কঠিন। মাঠের ভিতরে ও বাহিরে নানা কারণে খবরের শিরোণাম হয়েছেন। যিনি মাত্র ২১ বছর বয়সে আস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট অ্যাকাডেমি থেকে বহিষ্কার হোন। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে সেরা কোচ জন বুকানন ও অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ কারো কথা কখনো শোনেনি।


তাঁর জন্য সবচেয়ে ভালো একটি স্মৃতি হলো- অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলে অভিষেক হওয়ার এক বছর পর ‘বল অব দ্য সেঞ্চুরি’র সময়ের কথা মনে করা যাক। ক্রিকেটের সবচেয়ে সম্মানজনক অ্যাশেজ খেলতে নেমেছেন প্রথমবারের মতো তিনি।


বল হাতে পেয়েছেন, অন্যদিকে ব্যাটিং হিসেবে দাঁড়িয়ে আছেন ওপাশে অভিজ্ঞ মাইক গ্যাটিং। ব্রাউন কালার চুলের এক বালক অল্প রানাপ নিয়ে বোলিং শুরু করলেন। বলে করলেন সেটি পড়লো লেগ স্ট্যাম্পের কিছুটা বাইরে। লেগ স্টাম্পে গার্ড নেওয়া গ্যাটিং খেলতে চাইলেন প্রপার ডিফেন্সিভ শট।


এরপর কী হলো কে জানে, তৎক্ষণাৎ গ্যাটিং, আম্পায়ার কিংবা উইকেটের পেছনে থাকা ইয়ান হিলি, কেউই বোঝেননি কী হলো। ওয়ার্ন তখন নিজের প্রথম অ্যাশেজ উইকেট পাওয়ার আনন্দে উদ্বেল।


লর্ডসের বিশাল স্ক্রিনে দেখা মিলল ওয়ার্ন-জাদুর। ২৩ বছর বয়সী ওয়ার্ন সেদিন ৪৫ ডিগ্রিতে বল ঘুরিয়েছিলেন প্রায় ২ ফুট! সেই দিনই ক্রিকেট বিশ্বকে জানান দিয়েছিলেন নতুন কিছু আসতে চলেছে। সবাই সাবধান!


শেন কেইথ ওয়ার্নের ক্যারিয়ার

১৯৯২ সালের জানুয়ারি মাসে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার অভিষেক হয়। ১৪৫ টি টেস্ট ম্যাচের ২৭৩ টি ইনিংসে তিনি ৭০৮টি উইকেট নিয়েছেন।

 

এছাড়াও, লোয়ার অর্ডারে ১৯৯ ইনিংসে ব্যাট করে তুলেছেন ১২ টি হাফ সেঞ্চুরি। তার ইনিংস সেরা বোলিং ফিগার ছিলো ৮/৭১। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি টেস্ট ক্যারিয়ারে সর্বোচ্চ ৯৯ রান করেন। ২০০৭ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি শেষ টেস্ট ম্যাচ খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন।

 

৩ ডিসেম্বর, ২০০৭ সালে মুরালিধরন তাকে টপকাবার আগ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন টেস্ট ইতিহাসের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি। তার ব্যক্তিগত ভালো পারফরমেন্সে অস্ট্রেলিয়া ১৯৯৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতে, যেখানে তিনি সেমিফাইনাল ও ফাইনালের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন।

 

১৯৯৬ বিশ্বকাপের রানার্সআপ দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। এছাড়া আইপিএল ও বিগ ব্যাশে টি ২০ লীগ খেলতে থাকেন, তার নেতৃত্বেই রাজস্থান রয়েলস প্রথম আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হয়, যেখানে তার অধিনায়কত্ব প্রশংসিত হয়েছিল। ২০১৩ সালে তিনি বিগ ব্যাশ খেলে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেন।


শেন কেইথ ওয়ার্ন কে নিয়ে বিতর্ক

২০০৩ সালের বিশ্বকাপ খেলার আগে ডোপ টেস্টে পজেটিভ আসায় তিনি নিষিদ্ধ হোন। পরে ২০০৪ সালে তিনি ক্রিকেটে ফিরেন, অস্ট্রেলিয়ার হয়ে আর ওয়ানডে না খেললেও টেস্ট খেলে যান।


এছাড়া ইংল্যান্ডের এক মডেলের সাথে অন্তরঙ্গ ছবি প্রকাশের পর নতুন বিতর্কে জড়ান তিনি।


সম্মাননা

মুত্তিয়া মুরালিধরন এবং রিচার্ড হ্যাডলির পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি তৃতীয় সর্বোচ্চ পাঁচ উইকেট শিকারী। তিনি ৩৭টি টেস্ট ফাইফার এবং একটি ওয়ানডে ফাইফারের সাথে ১০টি টেস্ট দশ উইকেট শিকার করেছেন।


২০০০ সালে শতাব্দীর সেরা অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট বোর্ড দলে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০০৭ সালে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ড ওয়ার্ন ও মুত্তিয়া মুরালিধরনের সম্মানে অস্ট্রেলিয়া-শ্রীলঙ্কা টেস্ট ক্রিকেট সিরিজের নাম ওয়ার্ন-মুরালিধরন ট্রফি রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।


অস্ট্রেলিয়ান আরেক কিংবদন্তি বলেন, ‘মাত্র ৫২ বছর বয়সে চলে যাওয়া ১০০ বছর বাঁচা একটা জীবনের মতোই, কারণ আমরা যারা ওয়ার্নকে চিনি ও ভালোবাসি, তারা সবাই তার জীবনকেই আগামী দিনগুলোতে উদ্যাপন করব। ৫২ বছর বয়সী তার জীবনটা ছিল ১০০ বছরের সমান।’


ক্রিকেট জাদুকরের মৃত্যুর পর ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের দল রাজস্থান রয্যালসের মালিক মনোজ বাদালে বলেছেন ‘এ সুযোগে তুমি গোটা দুনিয়াকে দেখাতে পারবে অস্ট্রেলিয়া কী অসাধারণ এক সুযোগ হারিয়েছে। দেখাতে পারবে তুমিই অস্ট্রেলিয়ার সেরা অধিনায়ক, যে কখনোই অধিনায়ক হতে পারেনি।’


আরও পড়ুনঃ লতা মঙ্গেশকর, এক নক্ষত্রের বিদায়