সিজোফ্রেনিয়া: মানসিক রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম জটিল রোগ

মানসিক অন্যান্য সমস্যার মধ্যে সিজোফ্রেনিয়া একটি জটিল মানসিক রোগ। এই রোগের অন্যতম লক্ষণ হচ্ছে চিন্তাধারা এবং অনুভূতি প্রকাশের মধ্যে কোনো সঙ্গতি থাকে না।

সিজোফ্রেনিয়া: মানসিক রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম জটিল রোগ
সিজোফ্রেনিয়া: মানসিক রোগগুলোর মধ্যে অন্যতম জটিল রোগ

মানসিক অন্যান্য সমস্যার মধ্যে সিজোফ্রেনিয়া একটি জটিল মানসিক রোগ। এই রোগের অন্যতম লক্ষণ হচ্ছে চিন্তাধারা এবং অনুভূতি প্রকাশের মধ্যে কোনো সঙ্গতি থাকে না। যেমন পরিবারের কেউ অথবা পরিচিত যারা আছেন তাদের প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করা। অর্থাৎ এই রোগীরা মনে করে তার খাবারে বিষ মিশিয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়াও আরও অহেতুক বিষয়ে সন্দেহ করে থাকেন তারা।


এ ধরণের রোগীদের নিয়ে খুব সমস্যায় পড়ে যান তার চারপাশের লোকজন। রোগীর এমন অদ্ভুত আচরণগুলো মানিয়ে নিতে বেশ কঠিন হয়ে যায় সবার জন্য।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাতে সিজোফ্রেনিয়াকে একটি মস্তিষ্ক-সম্পর্কিত রোগ বলে অবিহিত করা হয়। যা সারা বিশ্বের মানুষকে আক্রান্ত করে। যার সংখ্যা প্রায় ২১ মিলিয়ন। এর সংখ্যা এতো হওয়া সত্ত্বেও এখনো সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা প্রায় ৫০ শতাংশ সঠিক চিকিৎসা পায় না। কারণ মানুষ এখনো এই সিজোফ্রেনিয়া সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নয়।


সিজোফ্রেনিয়া কি?

সিজোফ্রেনিয়া এমন একটি মানসিক ব্যাধি যা আক্রান্ত ব্যক্তির চিন্তাভাবনা এবং বোঝার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। এমনকি এই ধরনের রোগীরা একটি কাল্পনিক জগতে বসবাস করতে শুরু করে। তারা বিভিন্ন ধরনের কণ্ঠস্বর শুনতে পায় যার অস্তিত্ব আসলেই নেই। এটি তার পুরো জীবনকে প্রভাবিত করে।


সিজোফ্রেনিয়ার প্রকারভেদ

সিজোফ্রেনিয়া বিভিন্ন ধরণের আছে। এগুলোকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন;


ক. Paranoid schizophrenia: এই রোগীর সবসময় মনে হয় তার উপর অত্যাচার করা হচ্ছে কিংবা অন্যরা তাকে গোপনে দেখছে।


খ.  Disorganized schizophrenia: এই ধরনের রোগীকে দেখে বিভ্রান্ত মনে হয়।


গ. Catatonic schizophrenia: রোগী স্থির হয়ে থাকে অথবা কথা বলতে না পারে সে।


ঘ. Undifferentiated schizophrenia: একটা উপশাখা যেটাতে কোনো Paranoid, Disorganized এবং Catatonic এর উপশাখার বৈশিষ্ঠগুলো লক্ষনীয় না।


ঙ. Residual Schizophrenia: যখন সাইকোটিক লক্ষণগুলো কমতে থাকে কিংবা আর দেখা যায় না।


উপসর্গ

প্রথম দিকে এই রোগটির লক্ষনগুলি হঠাৎ করেই দেখা দেয় এবং গুরুতর হয়। এজন্য সিজোফ্রেনিয়ার কমন উপসর্গগুলোকে তিনটি বিভাগে ভাগ করা যায়। যথা; পজিটিভ উপসর্গ, কগনিটিভ উপসর্গ এবং নেগেটিভ উপসর্গ।


১. সিজোফ্রেনিয়া এর পজিটিভ উপসর্গ

এখানে পজিটিভ কথাটিকে অনেকেই ভালো বলে মনে করতে পারেন। আসলে এই পজিটিভ কথাটি দিয়ে “ভালো” বোঝানো হচ্ছে না। বরং এর চিন্তাভাবনা এবং ব্যবহার যা বিচারশক্তিহীন হয়ে যায় এমন কিছুকে বোঝানো হচ্ছে। মাঝেমধ্যে এগুলোকে সাইকোটিক উপসর্গও বলা হয়।


এই পজিটিভ উপসর্গগুলো হচ্ছে -

ক. বিভ্রম বা Delusions

বিভ্রম বা Delusions হচ্ছে অদ্ভুত বিশ্বাস যার সাথে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই। এই ধরনের ব্যাক্তিদের বাস্তবিক তথ্য দেওয়া হলেও তাদের বিশ্বাসের পরিবর্তন হয় না। যেমন ; এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মনে হতো পারে তাকে সবাই ভুল বোঝাচ্ছে অথবা মানুষ তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে ইত্যাদি অমূলক চিন্তা হতে পারে।


খ. অলীক কিছুর অস্তিত্বে বিশ্বাস বা Hallucinations

অলীক কিছুর অস্তিত্বে বিশ্বাস বা Hallucination এ আক্রান্ত ব্যাক্তি সবসময় অবাস্তব জিনিস অনুভব করে। তাদের সবসময় মনে হয় তারা কিছু দেখতে পাচ্ছে বা শব্দ শুনতে পাচ্ছেনবা অদ্ভুত গন্ধ পাচ্ছে অথবা শরীরে কোনো জিনিস লেগে না থাকলেও কিছু একটা শরীর স্পর্শ করছে এমন মনেহতে পারে।


গ. Catatonia

রোগী দীর্ঘ সময় ধরে একটা জায়গায় স্থির থেকে যায়।


২. কগনিটিভ উপসর্গ

ক. ঠিকমতো তথ্য না বুঝে, চিন্তা না করে কাজ করা।

খ. অমনোযোগি হওয়া।

গ. কোনো তথ্য জানা সত্ত্বেও সেটা কোন কাজে ব্যবহার করতে না পারা।


৩. নেগেটিভ উপসর্গ

এখানে নেগেটিভ বলতে আবার “খারাপ” বোঝানো হয় না। বরং ব্যক্তির সাধারণ কিছু ব্যবহারের অনুপস্থিতিকে বোঝানো হয়। যেমন;

ক. আবেগের অনুপস্থিতি

খ. সব কিছু থেকে বিরত থাকা অর্থাৎ একা একা থাকা

গ. শক্তি হ্রাস পাওয়া

ঘ. অনুপ্রেরণার অভাব

ঙ. জীবনের প্রতি অনীহা

চ. শরীরের যত্ন না নেওয়া


সিজোফ্রেনিয়া হওয়ার কারণ

সিজোফ্রেনিয়া কেন হয় তার সঠিক কারণটা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে গবেষকরা সিজোফ্রেনিয়া হওয়ার কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করেন। যেমন;


১. বংশগত বা জেনেটিক্স

বাবা-মা’র মাধ্যমেও এই রোগ সন্তানের হতে পারে। অর্থাৎ বংশগত কারণেও এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।


২. পরিবেশগত কারণ

ভাইরাস সংক্রমণ, টক্সিনের আশেপাশে সময় ব্যায় করা, অত্যন্ত চাপগ্রস্থ পরিস্থিতি ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে সিজোফ্রেনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।


চিকিৎসা

কোনো রোগীকে দেখার পর যদি ডাক্তার বোঝেন যে তার সিজোফ্রেনিয়ার উপসর্গ আছে তাহলে তিনি রোগীকে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট অথবা সাইকোলজিস্ট এর কাছে অবশ্যই পাঠাবেন।


সাইকিয়াট্রিস্ট এবং সাইকোলজিস্টরা রোগীর মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করে এবং তারা কমপক্ষে ৬ মাস রোগীকে দেখেন। এর মধ্যে যদি রোগীর সিজোফ্রেনিয়ার উপসর্গ থাকে তাহলে তাকে সিজোফ্রেনিয়া রোগী বলে ধরা হয়।


প্রথমে সাইকিয়াট্রিস্ট এবং সাইকোলজিস্টরা বিভিন্ন মানসিক চিকিৎসা দ্বারা সিজোফ্রেনিয়া এর বিভিন্ন উপসর্গকে ভালো করার চেষ্টা করে থাকে। এতে অনেক রোগী সিজোফ্রেনিয়া উপসর্গগুলোকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে শিখে।


পরিশেষ

আর যে সকল রোগীরা তার নিজের অথবা অন্যদের ক্ষতি করতে পারে কিংবা নিজেদের যত্ন নিতে পারে না বাড়িতে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করার কথা বলা হয়।


আজ এই পর্যন্তই। সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। ধন্যবাদ।


References:

1. What Is Schizophrenia?
2. Schizophrenia: An Overview


আরও পড়ুনঃ Personality Disorder বা ব্যক্তিত্বের ব্যাধি সম্পর্কে জানুন