হেলেন কেলার: এক শতাব্দী পরেও আমাদের অনুপ্রেরণা

সেই সময়ে যেটাকে অসম্ভব বলে মনে হত সেটাকে হেলেন কেলার সম্ভব করেছেন। তাঁর হাত ধরেই আজ হাজারো দৃষ্টি, বাক, শ্রবণ প্রতিবন্ধী স্বাবলম্বী হচ্ছেন। হেলেন কেলার সারাজীবন কোটি কোটি মানুষের মনে অনুপ্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকবেন।

হেলেন কেলার: এক শতাব্দী পরেও  আমাদের অনুপ্রেরণা
হেলেন কেলার: এক শতাব্দী পরেও আমাদের অনুপ্রেরণা

হেলেন কেলার (Helen Adams Keller) একজন সমাজসেবক, বক্তা, লেখক, রাজনৈতিক কর্মী। তার পুরো নাম হেলেন অ্যাডামস কেলার। হেলেন কেলার কোটি কোটি মানুষের অনুপ্রেরণার নাম। চমৎকার এই মানুষটি ঠিক সাধারণ মানুষের মত ছিলেন না। খুব কম বয়সে তিনি দৃষ্টি, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী হন।


সাধারণ মানুষের চোখে এগুলো প্রতিবন্ধকতা মনে হলেও তিনি এই প্রতিবন্ধকতাকে শক্তিতে পরিণত করেছিলেন। পরবর্তীকালে এই অসাধারণ ব্যক্তিত্ব নিজেকে একজন সফল মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং কোটি কোটি মানুষকে জীবন সংগ্রামে টিকে থাকতে উৎসাহিত করেন।


হেলেন কেলারের জন্ম ও মৃত্যু

হেলেন কেলার ১৮৮০ সালের ২৭ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তুসাকুম্বিয়া, আলবামায় জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের সময় তিনি সুস্থ থাকলেও পরবর্তীতে তিনি মুক, বধির ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী হন। ১ জুন, ১৯৬৮ সালে হেলেন কেলারের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। মৃত্যুর সময় তিনি আমেরিকার ইস্টন শহরে ছিলেন। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর।


হেলেন কেলারের পিতামাতা

হেলেন কেলারের পিতার নাম অর্থার এইচ কেলার, যিনি একজন এডিটর ছিলেন এবং তার মায়ের নাম কেট এডামস কেলার।


হেলেন কেলার ও তার প্রতিবন্ধকতা

হেলেন কেলার মাত্র ১৮-১৯ মাস বয়সে একটি গুরুতর রোগে আক্রান্ত হন। স্কারলেট জ্বর নামে এই রোগ খুব কম মানুষের হয়। জ্বর সেরে যায়, জীবন বেঁচে যায় কিন্তু রেখে যায় ছোপ ছোপ লাল দাগ। জীবন বেঁচে গেলেও পরবর্তীতে তিনি তার শ্রবণ, বাক ও দৃষ্টি শক্তি হারান চিরতরে।


তার যখন ৬ বছর বয়স তার পিতামাতা তাকে ওয়াশিংটন এর প্রসিদ্ধ বিজ্ঞানী ও টেলফোন আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহামবেলের কাছে নিয়ে যান।


তিনি তাকে পরীক্ষা করেন এবং বলেন, “যদিও হেলেন তার দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাক শক্তি কখনো ফিরে পাবেনা কিন্তু তাকে যদি ভালোভাবে প্রশীক্ষণ দেয়া হয় হেলেন অনেক সফল হবে জীবনে।”


হেলেন কেলারের শিক্ষাজীবন

ছোটবেলা থেকেই হেলেন কেলারের পড়াশোনার প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। কিন্তু তার পিতামাতার তেমন আগ্রহ ছিল না তাকে স্কুলে পাঠানোর। মেয়ের আগ্রহের কারণে আর আলেকজান্ডার গ্রাহামবেলের পরামর্শে তার পিতামাতা তাকে বেল বোস্টনের পার্কিনস ইন্সটিটিউশনে ভর্তি করেন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৪ বছর।


এই প্রতিষ্ঠানটি অন্ধদের শিক্ষা দিত। সেখানে হেলেনের পরিচয় হয় ওই ইন্সটিটিউট এর শিক্ষক অ্যানি সুলিভ্যান ম্যানসফিল্ড এর সাথে। এই শিক্ষকও ছোটবেলায় চোখে কম দেখতেন। তার হাত ধরেই হেলেনের জীবন আলোকিত হয়। এই শিক্ষক হেলেনের মধ্যে স্পর্শশক্তির বিকাশের চেষ্টা করেন। তিনি তাকে বাড়িতে গিয়ে পড়াতেন।


যদিও প্রথম দিকে শুধু স্পর্শের মাধ্যমে কোনো জিনিসের নাম ও ব্যবহারিক অর্থ বোঝাতে সে অসমর্থ হয় কিন্তু তার ছাত্রীর হাত সে কখনো ছাড়েনি। কয়েক বছরের মধ্যে হেলেন ইংরেজি, ল্যাটিন, গ্রিক, ফরাসি, জার্মান ভাষায় পারদর্শী হয়ে ওঠে। পরে সে ব্রেইল টাইপ রাইটারে লিখতে শেখে।


তাঁর শিক্ষক তাকে প্রথম “Water” শব্দটি লিখতে শেখান। তিন বার হাতে ধরে শেখানোর পর চার বারের বেলা শব্দটি নিজেই তিনি লিখতে পারেন। ১০-১১ বছর বয়সে নরওয়েতে উদ্ভাবিত এক বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করে সে কথা বলতে শেখে। ১৯০৪ সালে তিনি প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হিসেবে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন মাত্র ২৪ বছর বয়সে। এরপরে তিনি এম এ এবং পি এইচ ডি ডিগ্রী লাভ করেন।


বক্তা হিসেবে হেলেন কেলার

হেলেন কেলার সারা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার বক্তব্য তুলে ধরেন। তার শিক্ষক অ্যানি তাকে যেভাবে আলোকিত করেছিল তিনিও চেষ্টা করেছেন তার মত অন্যদেরকে আলোকিত করতে। তিনি বিভিন্ন মঞ্চে বক্তৃতা দিয়েছেন। তার বক্তৃতার অনেক অনুরাগী এবং ভক্ত ছিল।


যুদ্ধাহত ব্যক্তিদের সেবায় হেলেন কেলার

জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে তিনি তার জীবন অন্ধ, মুক ও বধিরদের জন্য উৎসর্গ করেন। তিনি বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন এবং যুদ্ধাহত ব্যক্তি, দুস্থ- পঙ্গু ব্যক্তিদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। তাদেরকে অনুপ্রাণিত করার জন্য সে বক্তৃতা দেয়ার সময় তার নিজের জীবনের গল্প বলতেন।


সাহিত্যে হেলেন কেলার এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে দেখা

হেলেন কেলার “Optimism” নামক আত্মজীবনীমূলক ছোটগল্প লিখেছেন। হেলেন কেলারের আত্মজীবনী “The Story of My Life (১৯০২)” তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। এই গ্রন্থে তিনি তার জীবনযুদ্ধের কথা অপূর্ব লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। হেলেনের রচিত বইয়ের সংখ্যা ১১টি। লেট আস হ্যাভ ফেইথ, দি ওয়ার্ল্ড আই লিভ ইন (১৯০৮), ওপেন ডোর ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি।


হেলেন বাক, দৃষ্টি, শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের নিয়ে তিনি একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। সেই চলচ্চিত্রে তার নিজের চরিত্রে তিনি নিজেই অভিনয় করেন। তিনি কবিতাও লিখতেন অবসরে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তার সুসম্পর্ক ছিল। ১৯৩০ সালে নিউইয়র্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে হেলেনের সাক্ষাৎ হয়।


রবীন্দ্রনাথকে তিনি স্পর্শের মাধ্যমে অনুধাবন করেন। রবীন্দ্রনাথ তাকে, “আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী” -এই গানটি নিজের গলায় গেয়ে শোনান। তিনি যেহেতু শুনতে, দেখতে পেতেন না তাই তিনি রবীন্দ্রনাথ এর ঠোঁট স্পর্শ করে সেই গান অনুভব করেন।


হেলেনের রাজনৈতিক জীবন

রাজনৈতিক বিষয়ে তিনি অভিজ্ঞ ছিলেন। এ বিষয়ে তিনি লিখালিখি করেছেন। ১৯০৯ সালে তিনি আমেরিকান সোশ্যালিস্ট পার্টিতে জোগদান করেন যার সমর্থক তিনি আগে থেকেই ছিলেন। ধনতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার শেষ এবং আয়ের সুষম বণ্টন দেখাই ছিল তার মূল উদ্যেশ্য।


তার বই “Out of the Dark” এ তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। তিনি শান্তিবাদী মানুষ এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জড়িত থাকার বিরুদ্ধে ছিলেন।


হেলেনের প্রাপ্ত পুরষ্কার

তিনি তার এই ছোট্ট জীবনে অনেক পুরষ্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো - Presidential Medal of Freedom (1964), National Women's Hall of Fame (1973), Alabama Women's Hall of Fame (1971), Labor Hall of honor (2010), Order of Merit, Order of Merit of the Italian Republic, Order of the southern cross, Knight of the Order of the southern cross, Order of the sacred treasure, Order of St Sava, Knight of the Legion of honor ইত্যাদি।


শেষকথা

বেশিরভাগ মানুষ তাদের ঘাটতি বা প্রতিবন্ধকতাকে দূর্বলতা হিসেবে ধরে নেয়। কিন্তু হেলেন কেলারের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি পুরোটাই উল্টোভাবে দেখা গিয়েছে। তিনি তার প্রতিবন্ধকতাকে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন।


চোখে দেখতে পান নি, কানে শুনতে পাননি, মুখে বলতে পারেন নি, কিন্তু হার মানেন নি। তার প্রবল ইচ্ছাশক্তি তাকে যুদ্ধে জয়ী করেছে। তার প্রতিবন্ধকতাকে ডিঙিয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাক, শ্রবণ আর দৃষ্টি শক্তি ছিল না বলেই হয়ত তিনি স্পর্শ শক্তিকে প্রবলভাবে কাজে লাগাতে পেরেছেন।


সেই সময়ে যেটাকে অসম্ভব বলে মনে হত সেটাকে সম্ভব করেছেন। তার হাত ধরেই আজ হাজারো দৃষ্টি, বাক, শ্রবণ প্রতিবন্ধী স্বাবলম্বী হচ্ছে। তিনি সারাজীবন কোটি কোটি মানুষের মনে অনুপ্রেরণা হয়ে বেঁচে থাকবেন।


আরও পড়ুনঃ জুলভার্ন: একজন দুনিয়া কাঁপানো বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা